‘প্রতিটা ইউনিয়নে ই-কমার্স ব্যবসা করতে চায়’

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, মিরাজুল ইসলাম জীবন// ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করছি। দীর্ঘদিন ব্যবসা করার পর বড় ধরণের একটা লোকসানের মুখে পড়ি। তারপর আবার ঘুড়ে দাঁড়াতে নতুন করে ই-কমার্সের ব্যবসা শুরু করি। যখন শুরু করি তখন ই-কমার্স সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। গুগলে সার্চ করে ই-কমার্স সম্পর্কে বাংলায় কোনো কন্টেন্ট পাওয়া যেত না। ইংলিশ কন্টেন্ট ডাউনলোড করে তা বাংলায় কনভার্ট করে পড়ে পড়ে তারপর ই-কমার্স সম্পর্কে জেনেছি। ২০১৪ সালে বিক্রয়-বাজার ডটকম নামে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করি। শুরুতে ঢাকার বাইরে থেকে ব্যবসাটা চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন ছিল। বিশেষ করে যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না এবং কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা নেই। মফস্বলে ব্যবসা করতে হলে মার্কেটিং একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার জন্য ঢাকায় আসাটা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তখন পড়াশুনার কারণে ঢাকায় আসতে পারিনি। তবে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকায় এসে খুব সামান্য মূলধন নিয়ে শুরু করি ই-কমার্স ব্যবসা

এভাবেই শুরুর গল্পটা টেকজুমটিভিকে বললেন বিক্রয়বাজারের ডিরেক্টর ও প্রধান নির্বাহী নুরুন নবী হাসান।

এতো কিছু রেখে ই-কমার্স ব্যবসায় আসার কারণ জানতে চাইলে জবাবে নুরুন নবী হাসান জানান, প্রযুক্তির উন্নতির সাথে ধীরে ধীরে মানুষ অনলাইনে পণ্য কেনার দিকে ঝুঁকছে। ঘরে বসেই শুধু অর্ডার দিয়ে সময়মত পণ্য হাতে পেয়ে যাচ্ছে। দিন দিন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন দেখলাম এর ভবিষৎ খুব ভাল, তখনই চিন্তা করলাম ই-কমার্স ব্যবসা করব। এইসব চিন্তা থেকেই মূলত আসা।

বিক্রয়-বাজার ডটকম নাম রাখার কারণ কী এমন প্রশ্নের জবাবে এই ই-কমার্স উদ্যোক্তা বলেন, ২০১৪ সালে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা চালু করি তখন একটি নামের প্রয়োজন হয়। অনেক নামই অনেকে বলছে। কিন্তু আমার কাছে এই নামটিই ভাল লাগে এবং এই নামটিই রাখা হয়।

এখানে কি ধরণের পণ্য এখানে পাওয়া যায় এবং এর মান কেমন জানতে চাইলে বিক্রয়বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এখানে মূলত তিন ধরণের পণ্য পাওয়া যায়, গেজেট, ইলেকট্রনিক্স এবং ফ্যাশন আইটেম। আমরা এখানে ভাল মানের পণ্য বিক্রয় করে থাকি। পণ্যের মান এবং ব্র্যান্ড চেক করে তারপর পণ্য বিক্রয় করা হয়। পণ্য আমাদের এখানে আনার পর আমি নিজে ক্রেতা হিসেবে পণ্যের মান এবং ব্র্যান্ড দেখে যদি ভাল লাগে তবেই ওই পণ্যটি বিক্রির জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। আমাদের এখানে ক্রেতার প্রাইরোটি প্রথম। তাই ক্রেতা যাতে পছন্দ করে এমন পণ্যই রাখা হয়।

পণ্যের ডেলিভারি ব্যাপারটা কি চ্যালেঞ্জের জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডেলিভারি ব্যাপারটা আসলেই চ্যালেঞ্জের। বিশেষ করে হোম-ডেলিভারির ক্ষেত্রে। আমরা সারাদেশেই ডেলিভারি করে থাকি। তবে ঢাকার বাইরে ডেলিভারির ক্ষেত্রে এস এ পরিবহণের কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করি। এছাড়া ঢাকার ভিতরে ডেলিভারির জন্য আমাদের নিজস্ব কিছু ডেলিভারি ম্যান আছে এবং আরও কিছু ডেলিভারি কোম্পানির সাথে আমাদের যোগাযোগ আছে তাদের মাধ্যমে ডেলিভারি করে থাকি।

বাংলাদেশ সরকার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে একটি ব্যবস্থা চালু করেছে, যেটি ডাকের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি করছে। কিন্তু তা এখনও ভালভাবে চালু হয়নি। এখনও অনেক কাজ করতে হবে এই প্রসেসে। অবশ্য ঢাকার ভেতরে কিছু কোম্পানি এই ব্যবস্থায় ডাকের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি করছে। যেহেতু এই ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গ না তাই আমরা এখন এটি ব্যবহার করছি না।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের অবস্থান সম্পর্কে নুরুন নবী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ই-কমার্স একটা অবস্থানে আছে। যখন ই-কমার্স ব্যবসা চালু হয়, তখন প্রথমে মানুষকে বোঝাতে হত ই-কমার্স কি? অনলাইনে শপিং এর কথা শুনলে মানুষ হাসতো, বিশ্বাস করত না, পাগল ভাবতো সবাই। কিন্তু এখন সবাই জানে ই-কমার্সের পরিচয়। যারা হাসতো, বিশ্বাস করত না, পাগল ভাবতো এখন তারাই অনলাইনে শপিং করছে। যতদিন যাবে বাংলাদেশে ই-কমার্সের অবস্থান ততো ভাল হবে এবং এর চাহিদাও বাড়বে।

ই-কমার্স ব্যবসায় পেমেন্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, বেশির ভাগই পেমেন্ট হয় ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়াও রকেট ব্যাংকিং, মাস্টার কার্ড, ভিসা কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে পেমেন্টের ব্যবস্থা আছে। ক্রেতা যেভাবে তার সুবিধা মনে করে সেইভাবেই পেমেন্ট করতে পারে। ফাস্ট অন কাস্টমার প্রাইরোটি মাস্ট।

ই-কমার্সের ভাল দিক এবং প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এর ভাল দিক হচ্ছে এর ক্যারিয়ার আছে। এর ভবিষ্যৎ ভাল। আমার মতে দেশের যুব সমাজ চাকরির পেছনে না ঘুরে ই-কমার্সে ক্যারিয়ার গড়তে পারে। যদি ভালভাবে ব্যবসা করা যায়, তাহলে এখান থেকে ভাল আয় করা সম্ভব। তবে এর প্রতিবন্ধকতাও আছে। এর প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল মূলধন। কারণ ই-কমার্স ব্যবসা করতে ভাল মূলধনের প্রয়োজন হয়। যদি কয়েকজন বন্ধুরা মিলেও শুরু করে, তাহলেও বেশিদিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না মূলধনের জন্য। আমাদের পরিবার থেকেও তেমন সাপোর্ট করে না। তাই আমাদের ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট খুব বেশি প্রয়োজন।

ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই উদ্যোক্তা বলেন, ভবিষৎ এর আমূল পরিবর্তন আসবে। হয়ত সব ক্ষেত্রেই ই-কমার্সের ব্যবহার হবে। এমনও হতে পারে একজন পান দোকানদারও ই-কমার্সের মাধ্যমে তার ব্যবসা করতে পারে। কারণ ঢাকার যানযটের যে অবস্থা তাতে করে যদি কারও পাঁচটি পণ্যের প্রয়োজন হয় তাহলে তাকে পাঁচ জায়গায় যেতে হবে। এতে করে সারাদিনেও সম্ভব নয়। দিন দিন ঢাকার অবস্থা আরও খারাপ হবে। কিন্তু ই-কমার্সের মাধ্যমে ওই পাঁচটি পণ্য একই স্থান থেকে খুব সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। হয়ত অর্ডার করতে তার দুই মিনিট সময় ব্যয় হবে এবং পণ্যগুলি একদিন পরে পাবে। কিন্তু এতে তার সময় এবং ভোগান্তি দুই কমবে। ঢাকার বাইরে রুরাল এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য করা হলে যেমন ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়বে তেমনি ই-কমার্স সম্পর্কে জানবে এবং এর ব্যবহারও বাড়বে। এজন্য সরকারকে এগিয়ে এসে তার প্রতিটি ইউনিয়নের ডাকঘরের মাধ্যমে ই-কমার্স ব্যবসায়িদের সহযোগিতা করতে হবে। যদি তা সম্ভব হয় তাহলে ওই গ্রামের এলাকায়ও আমরা খুব সহজে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে পারবো।

ই-কমার্সের স্ট্যাটাস এবং ফান্ডিং কমিটিতে কি ধরণের কাজ করছে জনাতে চাইলে তিনি বলেন, ই-কমার্সের স্ট্যাটাস এবং ফান্ডিং কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছি ই-কমার্স ব্যবসায় আগ্রহীদের জন্য। যাদের স্ট্যাটাস আছে কিন্তু ফান্ড নেই, তাদের জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করছি। এব্যাপারে আমরা সরকার, আইটিসি এবং আইটি সেক্টরের অনেকের সাথে কথা বলছি। ই-কমার্সে আসতে আগ্রহীদের স্ট্যাটাস অনুযায়ী তাদের ফান্ড সুবিধা দিতে কাজ করছি। তবে সরকারও এব্যাপারে নজর দিচ্ছে।

নতুনদের জন্য এই উদ্যোক্তা বলেন, প্রতিনিয়তই অনেকে ই-কমার্স ব্যবসায় আসতে চায়। কিছু আসে এবং ব্যবসা শুরু করে কিছুদিন পর ব্যবসায় লোকসান করে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যায়। এতে করে ই-কমার্স বাজারের দুর্নাম হয়। আমার কাছেও প্রতিদিন অনেকেই আসে ই-কমার্স সম্পর্কে জানতে। তাদের সবাইকে আমি বলতে চাই যদি ই-কমার্স ব্যবসা করার দৃঢ় ইচ্ছা আছে, তারা সবাই প্রথমে ই-কমার্স সম্পর্কে জেনে, বুঝে এবং বিশেষভাবে গবেষণা করে আসুন এবং ব্যবসা করে লাভবান হন।

ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ বিষয়ে তাঁর ভাবনা হলো- ইতোমধ্যেই ঢাকার বাইরে বিক্রয়-বাজার ডটকমের দুইটা অফিস আছে। এটা আমি সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। এছাড়া সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যে প্রজেক্টের আওতায় প্রায় ৫৭০০ ডিজিটাল সেন্টার আছে, এই সেন্টারের সাথে মিলে সারাদেশের প্রতিটা ইউনিয়নে ই-কমার্স ব্যবসা করতে এবং ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছে দিতে চাই।

টেকজুমটিভি/এমআইজে/এএস

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন