কাইচাঁন গ্রাম থেকে দেশের গন্ডি ছাড়ানো এক উদ্যোক্তা

0

শুরুটা ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাইচাঁন গ্রাম থেকে। কিন্তু এখন সেবা দিচ্ছে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে। কথা বলছি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা আরাফাত রহমান ও তার টিম সফটএভার-এর। তারা দেশের মফস্বলে বসে আন্তর্জাতিক মানের আইটি সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম আইসিটি নগরী হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ করে যাচ্ছেন। তরুণ উদ্যোক্তা আরাফাত রহমানের এগিয়ে চলার গল্প জানিয়েছেন তিনি নিজেই। তার সঙ্গে আলাপনে ছিলেন মিরাজুল ইসলাম জিবন।

এতো অল্প বয়সে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা হল কেন?
২০১৩ সালে ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্টের কাজ শেখা শুরু করি । প্রথমে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং এর প্রতি আগ্রহী ছিলো কিন্ত পরবর্তীতে মার্কেট রিসার্চ করতে গিয়ে দেখি আমাদের লোকাল মার্কেটে এসব কাজের প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং লোকাল মার্কেটকে ডেভেলপ করে নিতে পারলে এখানেই প্রচুর পরিমাণ কাজ করা যাবে । আর এর ফলে আমাদের দেশের আইটি ইন্ড্রাস্টি আরো এগিয়ে যাবে ।

বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন
বর্তমান অবস্থা বলতে গেলে আলহামদুলিল্লাহ ভালো ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি আমরা । মূলত সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করে থাকি, পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব সলিউশন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়েও কাজ করছি । মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও যুক্তরায্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবে কাজ করছে সফটএভার এবং ১০টিরও বেশী দেশে আইটি সেবা দিচ্ছি আমরা। দেশে আমাদের ৫০০’রও বেশী কায়েন্ট আছে ।

আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে কার কার অবদান আছে ?
আমার বাবা কাজের সুবাদে দেশের বাইরে থাকেন। আমার এই এগিয়ে যাওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় অবধান হল আমার মায়ের । আমার মা আমার ভাল কাজ গুলোকে সবসময় সমর্থন দেন । তাছাড়া আমার টিমের সকল সদস্য, যাদের পরিশ্রমে আজকের সফটএভার ।

কাজের ক্ষেত্রে কি ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যার সম্মুখিন হয়েছেন?
ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা এবং অসুবিধার থাকাটাই তো স্বাভাবিক। বিশেষ করে ইন্টারনেটের সমস্যা ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এখানকার ব্রডব্যান্ড প্রোভাইডারদের সার্ভিস খুবই নিন্মমানের। একদিকে সাপোর্ট দুর্বল অন্য দিকে স্পীড অনেক কম এবং মূল্য বেশী। তাছাড়া, যেহেতু আমরা সফটওয়্যার নিয়ে মফস্বলে কাজ করছি সেহেতু লোকাল কায়েন্টেরকে আধুনিক সফটওয়্যার এবং ওয়েবসাইট সম্পর্কে বুঝাতে একটু কষ্টকর হয়ে যায় ।

বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রতিবন্ধকতাগুলো কি? সমাধানের কথাও বলেন।
যেহেতু উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি সেহেতু প্রথম বাঁধাটা পরিবার থেকেই আসে। আমাদের দেশের বেশীর ভাগ অভিবাবকরা সন্তানদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়তে বাঁধা দিয়ে থাকেন। কারণ; তাদের স্বপ্ন সন্তান পড়াশোনা করে চাকুরী করুক। তবে বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগে দেশের সাধারণ মানুষের এই চিন্তা ধারায় পরিবর্তন আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই এধরনের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সহজ হচ্ছে। সরকার বা বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে আইটি উদ্যোগতারা আর্থিক সহযোগিতা এবং আইটি সম্পর্কিত কাজ গুলো বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে না করিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করালে উভয়-ই উপকৃত হবে ।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার পরামর্শ
আমি যেহেতু ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করি, তাই সৃজনশীলতার বিষয়টিও কাজের মধ্যে থাকতে হয়। এ কারণে নিজের চারপাশ থেকে শেখার ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও জড়িত । ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্যারিয়ার গড়তে হলে অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে।’, কাজে অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা আসবে, তাই বলে থেমে যাওয়া ঠিক নয়। এসব কাজ করতে গেলে অবশ্যই ধৈর্য প্রয়োজন। মেধা, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে নিজের কাজটি করতে হবে। আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ইন্টারনেট স্পিড খুব কম ছিল, আবার অনেক সময় ইন্টারনেট থাকত না কিন্তু তারপরও ধৈর্যহারা না হয়ে প্রয়োজনীয় কাজকে এগিয়ে নিয়েছি।

কি কি সেবা দেয় সফটএভার ?
সফটএভার মূলত একটি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, ওয়েব এবং ডেক্সটপ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব সলিউশন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করা হয় । তাছাড়া ডোমেইন-হোস্টিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান “হোস্টঅ্যারোমা” সফটএভার-এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ।

সফটএভার এর ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে আরাফাতের স্বপ্ন অনেক, সে স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছেন তিনি, যতই এগোচ্ছেন সামনে আরো নতুন পথ ও সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরাফাত বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা রয়েছে সফটএভারের কাজের পরিধি আরো বিস্তৃত করা। দেশের এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হতে চাই আমরা ।’


আপনি আর কি কি করছেন?
ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম আইসিটি নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। তারই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহের আইটি প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় অনলাইন কমিউনিটি “ময়মনসিংহ আইটি পার্ক” এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও তিনি। আরাফাত বলেন, আইসিটিতে উন্নত দেশ সমূহের কোন আইসিটি নগরীই রাজধানী কেন্দ্রীক গড়ে উঠেনি তবে আমাদের দেশের আইসিটি নগরী রাজধানী কেন্দ্রীক গড়ে উঠায় আইসিটি শুধু রাজধানীতেই সিমাবদ্ধ থাকছে। তাই রাজধানীর বাহিরে শিক্ষা-সাহিত্য, স্বাস্থ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম আইসিটি নগরী হিসেবে গড়তে কাজ করছি স্থানীয় আইটি উদ্যোক্তারা।
এছাড়া ময়মনসিংহকে একটি আধুনিক পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ করে যাচ্ছে তরুণ এই আইটি উদ্যোক্তা। ময়মনসিংহে পরিচ্ছন্ন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন “ময়মনসিংহ কিন” এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রতি সপ্তাহের নিদ্রিষ্ট দিনে নিজ হাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে কিন অভিযান করে থাকে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে নিয়মিত বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন