মুক্ত সফটওয়্যার এখন মানবাধিকার: স্টলম্যান

0

সফটওয়্যার স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান। সংক্ষেপে আরএমএস নামেও পরিচিত। ১৯৮৩ সালে স্বাধীন সফটওয়্যার আন্দোলনের জন্য ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন (এফএসএফ) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ৬১ বছর বয়সী রিচার্ড স্টলম্যান একাধারে কম্পিউটার প্রোগ্রামার, হ্যাকার ও সমাজকর্মী। ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশন‍-বাংলাদেশ আয়োজিত ‘একটি মুক্ত ডিজিটাল সমাজ’ সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করেন। ফিরে যান ১৩ ডিসেম্বর। সেমিনারের পর তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নুরুন্নবী চৌধুরী

মুক্ত সফটওয়্যার বা সফটওয়্যারের স্বাধীনতা আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান: আমরা এমন একটা সম্প্রদায় তৈরি করতে চেয়েছি, যাতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকবে। চাইলে এই সফটওয়্যার নিজেদের মধ্যে বা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি (শেয়ার) করে নেওয়া যাবে।

সাধারণভাবে মুক্ত সফটওয়্যার কি নির্দিষ্ট কোনো দলের সদস্য কিংবা নির্দিষ্ট কারও জন্য তৈরির ব্যাপারে ভেবেছিলেন?

স্টলম্যান: আমরা মুক্ত সফটওয়্যার তৈরি কিংবা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি সবার জন্য। এখানে নির্দিষ্ট কোনো সদস্য বা ব্যক্তি নেই। এর কারণ, সব ব্যবহারকারীই চায় স্বাধীনতা। তাই আমাদের সফটওয়্যার সবার জন্যই তৈরি। শুরুতে আমরা ‘ইউনিক্সে’র মতো দেখতে একটি সফটওয়্যার (অপারেটিং সিস্টেম) তৈরি করেছিলাম, যা কিছুটা অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীদের জন্য ছিল। পরবর্তীকালে আমরা আরও উন্নতভাবে সফটওয়্যার তৈরির কাজ করেছি, যাতে সবাই এটি ব্যবহার করতে পারেন।

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে কিছু সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবী এসব সংগঠনের সদস্যরা মুক্ত সফটওয়্যার জনপ্রিয় করার কাজটি করে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

স্টলম্যান: আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের সফটওয়্যার ব্যবহারকারীরাও চান সফটওয়্যার ব্যবহারের স্বাধীনতা। নিজের ব্যক্তিগত সফটওয়্যারে তাঁরাও চান না বহুজাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব। শুধু প্রতিষ্ঠানই নয়, ব্যক্তি হিসেবেও কারও নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেউ আশা করেন না। তবে এ বিষয়টি নিয়ে সবাইকে সচেতন করে তোলাটা জরুরি, যা বিশ্বের অনেক দেশেই হচ্ছে। সফটওয়্যার স্বাধীনতার বিষয়টি সারা বিশ্বে একই রকম। আমাদের       এই আন্দোলন সারা বিশ্বেই এক এবং সারা    বিশ্বের জন্য।

এফএসএফের নেতৃত্বে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী?

স্টলম্যান: আমরা আসলে এমন পর্যায়ে নেই, যেখানে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব। অলাভজনক সংস্থা এফএসএফ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবকদের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। একসময় আমরা জিএনইউ প্রকল্প চালু করেছি এবং সে সময়ে একধরনের লক্ষ্য ছিল মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনকে বেগবান করার। এখন আমাদের সে পরিমাণ অর্থ নেই, যা দিয়ে আমরা কাউকে নিয়োগ দিতে পারি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারি। তাই আমাদের কোনো পরিকল্পনা সেভাবে হয় না। আমরা শুধু সাধারণভাবেই সচেতনতা তৈরির কাজটি করে যাচ্ছি।

কত দিন চলবে এই আন্দোলন?

স্টলম্যান: আমরা ঠিক জানি না, হয়তো আরও ১০ বছর কিংবা ২০ বছর। এর বেশিও চলতে পারে। আমরা নির্দিষ্ট করে এটা এখনই বলতে পারছি না।

বাংলাদেশে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনে যুক্ত তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

স্টলম্যান: আমি নির্দিষ্টভাবে কোনো তরুণ, বৃদ্ধ কিংবা অন্য কাউকে তেমন কিছু বলতে চাই না। আমি যা বুঝি, যিনি কম্পিউটার ব্যবহার করবেন, তাঁর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে সেটার ওপর। এটা সারা বিশ্বের সব জায়গায় একই রকম। এটা খুব অনৈতিক যে, আপনার কম্পিউটারে থাকা সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে। তাই সফটওয়্যার হতে হবে স্বাধীন এবং ব্যবহারকারীও এটাই আশা করবেন যে, তাঁর ব্যবহৃত সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই থাকবে।

তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, কারও হাতেই সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি থাকবে না…

স্টলম্যান: এটা থাকা উচিত মুক্ত এবং তা সবার জন্য। কারণ, এ বিষয়টিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বড় বড় প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে ব্যবহারকারীদের ওপর।

মুক্ত সফটওয়্যার বর্তমান প্রযুক্তিগত সময়ের সঙ্গে কতটা মানানসই? কিংবা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য?

স্টলম্যান: আমরা একটা বিষয় কিন্তু বাদ দিচ্ছি। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি নতুন নতুন সুবিধা নিয়ে আসছে, তবে যেটা খুবই জরুরি তা হচ্ছে সফটওয়্যার স্বাধীনতা। এটা সব সময়ই থাকা উচিত। কারণ, এ নিয়ন্ত্রণ একবার অন্যদের হাতে চলে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হবেন ব্যবহারকারীরা। আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ব্যবহারকারীদের এ ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা। যাতে করে একসময়ে ব্যবহারকারী নিজেই বলতে পারেন যে আমার কম্পিউটারের সবকিছুই নিজের নিয়ন্ত্রণে। এটাও তিনি বুঝতে পারবেন যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রোপ্রাইটরি সফটওয়্যার দিতে চেষ্টা করে, তবে সেটি ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি, সমাজে মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার আসলেই কতটা প্রয়োজন, তা তুলে ধরতে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

স্টলম্যান: আপনাকেও ধন্যবাদ। হ্যাপি হ্যাকিং।

রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যানরিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান
জন্ম: ১৬ মার্চ ১৯৫৩, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
l   হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন স্টলম্যান।
l   হার্ভার্ডের প্রথম বর্ষের শেষ দিকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ‘এমআইটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাব’–এ প্রোগ্রামিং করা শুরু করেন। তিনি হ্যাকার সম্প্রদায়ে ‘আরএমএস’ নামে পরিচিতি পান।
l   ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সফটওয়্যার উন্মুক্ত করার কাজে স্টলম্যান চালু করেন ‘প্রজেক্ট জিএনইউ’, যার লক্ষ্য ছিল একটি ‘ইউনিক্স’-এর মতো একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা। ১৯৮৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এফএসএফ।
l   স্টলম্যান এখনো এমআইটির অবৈতনিক গবেষক। তিনি সাদামাটা জীবন যাপন করেন।
l   ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত এমআইটির গবেষণাগারই ছিল তাঁর ‘বাসস্থান’। তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না, কোনো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান যেন তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে। একই কারণে তিনি তাঁর অফিসঘর খোলার জন্য কোনো কার্ড-চাবি ব্যবহার করেন না।
l   কোনো ইন্টারনেট সংযোগদাতার সংযোগ নয়, নিজের সার্ভার দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তিনি।
l   দ্য রাইট টু রিড, মেইড ফর ইউ ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংনামে তিনটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লিখেছেন রিচার্ড স্টলম্যান।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন