কীভাবে তৈরি হবে উড়োজাহাজে আরামদায়ক আসন

0

আরাম করে আধশোয়া ভঙ্গিতে হেলান দেওয়া যাবে কি না— প্রশ্নটি উড়োজাহাজের যাত্রীদের কাছে খুবই পরিচিত। কেউ নিজের আসন এলিয়ে দিতে চান; আবার কেউ চান না। বিষয়টি নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বিতর্ক, বাগ্বিতণ্ডার জেরে উড়োজাহাজ জরুরি অবতরণ করানোর নজিরও রয়েছে।

কিন্তু যাত্রীদের কতটা দোষ দেওয়া যায়? দীর্ঘ আকাশভ্রমণে আরাম করে বসতে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর তাঁদের অসন্তোষের কারণ হিসেবে উড়োজাহাজের আসনগুলোর ত্রুটিপূর্ণ গঠনকেই দায়ী করতে হয়। কারণ, এসব আসন বিভিন্ন আকারের শারীরিক গঠনের যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী আরাম করে বসার অনুপযোগী।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিজাইন, হাউজিং অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ক্যাথলিন এম রবিনেট বলেন, উড়োজাহাজের প্রচলিত আসনের নকশা ঠিকভাবে করা হয়নি। এসব আসন সবার শারীরিক গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মার্কিন বিমানবাহিনী এবং ৩৫টি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় নেতৃত্ব দেন রবিনেট। ২০০২ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি উড়োজাহাজের আসন নির্মাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নকশাকারদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। ওই সমীক্ষায় উত্তর আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস ও ইতালির মোট চার হাজার ৪৩১ জনের শারীরিক গঠন পরিমাপ করা হয়। তাঁদের বসা ও দাঁড়ানোর ভঙ্গি এবং ওজন, উচ্চতা থেকে শুরু করে জুতার মাপ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। রবিনেট ও তাঁর সহযোগী গবেষকেরা এসব তথ্য-উপাত্ত ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করেন।

আসনের নকশা তৈরির জন্য মানুষের বসার ভঙ্গি যাচাই করার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে, ব্যক্তির নিতম্ব থেকে হাঁটু পর্যন্ত দূরত্ব, নিতম্বের বিস্তার এবং হাঁটুর উচ্চতা। এসব তথ্য-উপাত্তে মানুষের পারস্পরিক বৈচিত্র্যের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রবিনেট বলেন, আসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সমীক্ষার তথ্য-উপাত্ত ঠিকমতো কাজে লাগতে পারেনি। প্রতিটি উড়োজাহাজে গড়ে অন্তত ১০ জন যাত্রীর বসতে সমস্যা হয়। এতে তাঁদের আশপাশের যাত্রীরাও অসুবিধায় পড়েন।

৯৫ শতাংশ ব্যক্তির শারীরিক গঠন পরিমাপের তথ্যের ভিত্তিতে আসন তৈরি করলেই সেগুলো সবার বসার উপযোগী হবে বলে আসন নির্মাতা ও নকশাকারদের ধারণা। এতে ওই আসনে বাকি ৫ শতাংশের স্থান সংকুলান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিতম্ব থেকে হাঁটু পর্যন্ত মাপটি বিবেচনায় রাখা হয়। যেমন, উত্তর আমেরিকার মানুষের ক্ষেত্রে গড় মাপ যদি হয় ২৬ দশমিক ৫ ইঞ্চি, ডাচদের ক্ষেত্রে সেটি ২৭ দশমিক ৬ ইঞ্চি। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, উড়োজাহাজের যাত্রীদের কারও বসার সময় হাঁটু ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে না। আবার তাঁদের পায়ের গঠন এবং ঊরুর দৈর্ঘ্যেও ব্যবধান থাকে। এ ছাড়া নারী-পুরুষভেদেও যাত্রীদের শারীরিক গঠনে পার্থক্য রয়েছে।

সিটগুরু ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইটে বেশ কিছু এয়ারলাইনসের আসনের আকার সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে। এতে বলা হয়, সাধারণ বিমানগুলোর আসনের বিস্তার ১৭ থেকে ১৮ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এগুলোতে বসতে সবাই ঠিকমতো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। শরীরের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশ সম্ভবত কাঁধ। এটি প্রায়ই পাশের যাত্রীদের কনুই বা কাঁধের সঙ্গে লেগে যেতে পারে। সহযাত্রীকে অস্বস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে কাঁধের একটি প্রান্ত আবার জানালায় গিয়ে লাগতে পারে। আসন ঠিক থাকলে হয়তো এসব অস্বস্তি এড়ানো যেত। আর এ কারণেই যাত্রীদের যত অসন্তোষ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাত্রীদের শারীরিক সংস্পর্শে বিভিন্ন রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকে। আবার আসন এলিয়ে দিতে গিয়ে অনেকের পায়ের সঙ্গে সামনের যাত্রীর আসনের পেছনের অংশ লেগে যায়। পাশাপাশি পায়ে পায়ে সংস্পর্শও হতে পারে।

রবিনেট বলেন, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে আঁটসাঁট হয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে যাত্রীর শরীরে নানা রকমের ব্যথা হতে পারে। এতে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে।
জার্মানিভিত্তিক আসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেকারো এয়ারক্রাফট সিটিংয়ের কর্মকর্তা রেনে ডাংকওয়ার্থ বলেন, উড়োজাহাজে সবার পা রাখার পর্যাপ্ত জায়গাসহ আরও আরামদায়ক আসনের ব্যবস্থা করা অবশ্যই সম্ভব। তবে এতে টিকিটের দামও বৃদ্ধি পাবে। নিউইয়র্ক টাইমস।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন