প্রতি বছরই একধিকবার অ্যাপল নতুন পণ্যের ঘোষণা দেয়। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে আসে আইফোনের নতুন মডেল আর জানুয়ারিতে ম্যাক বা আইপ্যাড। তাহলে মঙ্গলবারের ‘অ্যাপল ইভেন্ট’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মঙ্গলবার ফ্লিন্ট সেন্টারে অ্যাপলের নতুন আইফোন আর অ্যাপল ওয়াচ ইভেন্টের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই স্মরণ করেছেন ১৯৮৪ সালকে। ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে ওই মঞ্চেই প্রয়াত স্টিভ জবস পার্সোনাল কম্পিউটিংয়ের যুগ পাল্টে দেয়া প্রথম ঘোষণাটি দিয়েছিলেন। বাজারে এসেছিল ম্যাকিনটশ। এরপর আবারো ওই মঞ্চে ফিরেছিলেন স্টিভ। ১৯৯৮ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন আইম্যাক-এর।

দ্বিতীয় ঘোষণাটি যুগান্তকারী হিসেবে হয়তো ম্যাকিনটশের সমকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেনা কোনোকালেই। তবে অ্যাপলের জন্য ওই বছর ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। আগের বছরই অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে স্টিভ জবস ফিরলেন অ্যাপলে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার প্রহর গুনছে। শেষ চেষ্টা হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে।

১৯৯৮ সালটি অ্যাপলের জন্য আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর থেকেই শুরু হয় জবস-আইভ যুগলবন্দীর। স্টিভ জবসের আইডিয়া আর জনি আইভের ডিজাইন মিলে চোখ ধাঁধাঁনো সব পণ্য এসেছে একের পর এক। সে যুগলবন্দীর সমাপ্তি ঘটে ২০১১ সালের অক্টোবরে।
২০১১ সালের অগাস্টেই অ্যাপলের হাল ধরেছিলেন টিম কুক। সে সময় থেকেই ক্রমাগত একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে অ্যাপলভক্ত, বিনিয়োগকারী আর প্রযুক্তিবোদ্ধাদের মনে। অ্যাপল কি উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকতে পারবে, নাকি ক্রমশ উজ্জ্বলতা হারিয়ে একসময় গড়পরতা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় খানিকটা ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হবে, যেমনটা হয়েছে সনির বেলায়।

স্টিভ জবস বেঁচে থাকতে বিশ্ব প্রযুক্তিবাজারে অ্যাপল বরাবরই চিহ্নিত হয়েছে নিয়ামক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। বেশিরভাগ প্রযু্ক্তিপ্রতিষ্ঠান যখন বাজারচলতি পণ্যের উন্নয়ন ঘটাতে ব্যস্ত, অ্যাপল তখন নিয়ে এসেছে একেবারে নতুন ঘরানার ডিভাইস যা দেখার আগে বাজারে এসবের একরতি চাহিদা ছিল না। এরপর গোটা ইন্ডাস্ট্রি ঝাপিয়ে পড়েছে ওই শ্রেণিভূক্ত পণ্য তৈরিতে। এ কথা সত্যি পার্সোনাল কম্পিউটার, আইফোন, আইপড এবং আইপ্যাডের বেলায়।

ফলে, স্টিভ জবসের প্রয়াণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, অ্যাপল কি পারবে তার উদ্ভাবনী ক্ষমতার ঝলক ধরে রাখতে? ডিজিটাল পণ্যে নতুন শ্রেণিপত্তনের রেওয়াজটি কি চালু থাকবে কুপার্টিনোর ‘১, ইনফিনিটি লুপ’ নামের ঠিকানায়?
প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট সবাই জানতেন উত্তরটি পাওয়া যাবে ৯ অক্টোবর। ওই দিনই টিভ জবসউত্তর নতুন শ্রেণির পণ্য আনতে পারে অ্যাপল। উত্তরটি হয়তো পাওয়া যাবে মঙ্গলবার টিম কুক-এর উচ্চারিত কথাগুলো মিলিয়ে দেখলে।

২০০৭ সালে স্টিভ জবস যখন আইফোনের প্রথম ঘোষণাটি দিলেন, তার বক্তব্য ছিল- “এই দিনটির জন্য আমি গত আড়াই বছর ধরে অপেক্ষা করছি।… কখনও কখনও এমন কিছু পণ্য আসে যা সব পাল্টে দেয়। ১৯৮৪ সালে ম্যাকিনটশ কেবল অ্যাপলকে পাল্টে দেয়নি। এটা গোটা কম্পিউটিং জগতকে পাল্টে দিয়েছিল। ২০০১ সালে আইপড কেবল যে আমাদের গান শোনার অভ্যাস পাল্টে দিয়েছিল তা নয়, এটা গোটা সংগীত শিল্পকে পাল্টে দিয়েছিল। আজ আমরা একই ধরনের পণ্যের ঘোষণা দিতে যাচ্ছি…”

সাত বছর পরে, ৯ সেপ্টেম্বর কি স্টিভ জবসের ওই ঘোষণাই নতুন সংস্করণ আকারে বেরুল? “আমরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করছি একেবারে নতুন ধরনের পণ্যের পেছনে…আমরা আশা করছি এটা এই শ্রেণির পণ্য বিষয়ে মানুষের ধারণা পাল্টে দেবে।… অ্যাপল যতবার যুগান্তকারী পণ্য এনেছে তার প্রতিটিই সঙ্গে এনেছে নতুন ইউজার ইন্টারফেইস। ম্যাক-এর সঙ্গে আমরা এনেছিলাম মাউস… ক্লিক হুইল এসেছিল আইপডে, আইফোনে এনেছিলাম মাল্টিটাচ।…অ্যাপল ওয়াচেও একই ঘটনা ঘটেছে। গতানুগতিক হাতঘড়ির ক্রাউন (চাবি) এখন ডিজিটাল ক্রাউন।”
ফ্লিন্ট সেন্টারের অনুষ্ঠানে এটা পরিষ্কার যে, ২০০৭ সালে অ্যাপলের কাছে আইফোন যা ছিল, ২০১৪ সালে এসে প্রতিষ্ঠানটির কাছে সেই একই গুরুত্ব বহন করছে অ্যাপল ওয়াচ। ফলে, আগামীতে অ্যাপল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লেখা হবে ৪২ মিলিমিটার ডিসপ্লেতে। মঙ্গলবার সেই ঘোষণাই দিলেন টিম কুক।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন