দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু’ উৎক্ষেপণ প্রকল্পের অর্থায়ন এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন ও জাপানের ঋণ প্রস্তাব বাতিলের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্রক্রিয়া থেকেও পিছু হটেছে সরকার। প্রকল্পটির অর্থায়নে বিকল্প কোনো পরিকল্পনাও নেয়া হয়নি। অথচ এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প অনুমোদনে তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

সম্প্রতি প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। কাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের জন্য তা উপস্থাপন করা হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের তহবিল থেকে দেয়া হবে ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর প্রকল্প সাহায্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) অর্থায়নের কোনো উত্স উল্লেখ করা হয়নি। অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাসংক্রান্ত তথ্যের স্থানটি খালি রাখা হয়েছে এতে। তবে অর্থায়নের ধরন লেখা হয়েছে টেন্ডার্স বা বিডার্স ফিন্যান্সিং।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পের পরিচালক গোলাম রাজ্জাক বলেন, প্রকল্পটি অর্থায়নে বিডার্স ফিন্যান্সে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেই অর্থ সংগ্রহ করবে। এর আগে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে এ ধরনের পদ্ধতি সফল হয়েছে। এজন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিডার্স ফিন্যান্স সবসময়ই কঠিন শর্তের ঋণ হয়ে থাকে। ঠিকাদার নিজ দেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে। এক্ষেত্রে দরকষাকষির সুযোগ না থাকায় সুদহার বেশি হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শর্ত দেয়া হয়। ঋণ পরিশোধের সময়ও কম থাকে। এ কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিডার্স ফিন্যান্সের দুটি প্রকল্প বেশকিছু দিন ধরে ঝুলে আছে।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক, ফ্রান্সের এইচএসবিসি ব্যাংক, যুক্তরাজ্যের সিডব্লিউজি গলফ ইন্টারন্যাশনাল, চায়না গ্রেট ওয়াল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন ও জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন। তবে কঠিন শর্তের কারণে সব ঋণ প্রস্তাবই বাতিল করা হয়। পিপিপিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে এতে ব্যয় বেশি হবে বিধায় তাও বাতিল করা হয়।

এর আগে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল (ইউএনডিপি), বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড করপোরেশনের (এসডিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোনো দাতা সংস্থার কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালে শুরু হয়ে ২০১৫ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রকল্প অনুমোদনই হয়নি। ফলে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে এর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থায়নের উত্স নিশ্চিত না করেই অনুমোদনের জন্য তা একনেকে উত্থাপন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০১৭ সালের জুনকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে চারটি পৃথক আর্ন্র্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। স্যাটেলাইটের মূল অংশ তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণ ও বীমার বিষয়ে পৃথক দরপত্র আহ্বান করা হবে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর পাঁচ বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের ব্যয় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিটিআরসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও রেডিও স্টেশনগুলো বিদেশী স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। স্যাটেলাইটের ভাড়াবাবদ প্রতি বছর ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করছে তারা। আগামীতে এ ভাড়া বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে। তবে নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে এ টাকা দেশেই রাখা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে স্যাটেলাইটের অব্যবহূত তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, শ্রীলংকাসহ আরো কয়েকটি দেশ এ সুবিধা নিতে পারে। উৎক্ষেপণের পর প্রতি বছর এ খাত থেকে প্রায় ৫ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে বিটিআরসি। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে মূল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই)। বাজার মূল্যায়ন, বাজারজাতকরণ, কাঠামো তৈরি, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন