লতিফ সিদ্দিকীর হাজার কোটি টাকা লুটের ছক

0

আবু আলী: বৈদেশিক কল আদান-প্রদানের লাইসেন্সধারী অপারেটরদের (আইজিডব্লিউ) কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের আয়োজন করেছিলেন সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এরই অংশ হিসেবে তিনি গঠন করেন একটি আইজিডব্লিউ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যাদের হাতে  আবদুল লতিফ সিদ্দিকী পুরো আইজিডব্লিউ ব্যবসা তুলে দেওয়ার ছক কষেছিলেন। এই সিন্ডিকেট গড়তেই তিনি বিতর্কিত একটি মডেল উপস্থাপন করেন, যা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আইজিডব্লিউ ব্যবসায়ীরা বলছেন, তার বিতর্কিত এই মডেল বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক কল থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট ছাড়াও আইজিডব্লিউ ব্যবসা কুক্ষিগত হয়ে পড়বে ওই সিন্ডিকেটের কাছে। আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এই অপকৌশলের সহযোগী ছিলেন এক প্রভাবশালী রাজনীতিক।

জানা গেছে, লতিফ সিদ্দিকীর ছত্রচ্ছায়ায় এবং বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় বিতর্কিত সিন্ডিকেট নতুন মডেলের মাধ্যমে এ খাতের সব লেনদেন করায়ত্ত করতে চেয়েছে। ইতোমধ্যে পুরনো ৩টিসহ ৪টি বিতর্কিত আইজিডব্লিউ বিটিআরসি কর্তৃক মনোনীত হয়েছে, যারা ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা লোপাটের অপকৌশল বাস্তবায়নের সহচর।

জানা গেছে, নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক ওই নেতা এর আগে শেয়ার কারসাজি করে আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলে। আবার এ সেক্টর থেকে নতুন করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগ দেন তিনি। সিন্ডিকেটটি আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরাম (আইওএফ) নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। সর্বশেষ তথ্যানুসারে ওই সিন্ডিকেট চক্র কৌশলে ২৩টি আইজিডব্লিউর মধ্যে ১৮টিকে এ সংগঠনের আওতায় নিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা অনুসারে আইজিডব্লিউগুলো একই লাইসেন্সের আওতায় থাকার কথা থাকলেও দুটি অসম স্তরে ভাগ করা হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে টায়ার-১ (১৬টি) ও টায়ার-২ (৭টি)। ২৮ সেপ্টেম্বর বিটিআরসি তাড়াহুড়ো করে সিন্ডিকেটের ৭টি আইজিডব্লিউকে মনোনীত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ৭টি কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিট ইনফোওয়ে, ডিজি কন, রুটস, গ্লোবার ভয়েস, মীর টেলিকম, বাংলা ট্রাক এবং নভো টেলিকম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই ৭ আইজিডব্লিউর মধ্যে ৪টি বিতর্কিত ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। গত জুন মাস পর্যন্ত এসব আইজিডব্লিউর কাছে বিআরটিসির পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লতিফ সিদ্দিকী ও বিটিআরসি চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে এ মনোনয়ন দেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত নতুন মডেল অনুসারে এ খাতের সব লেনদেন সিন্ডিকেট ‘টায়ার-২’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানের সব অর্থ হস্তান্তর করতে হবে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেটের কাছে। পরে সিন্ডিকেট তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার (বিটিআরসি, আইসিএক্স, এএনএস) কাছে হস্তান্তর করবে। প্রসঙ্গত, লাইসেন্সিং গাইডলাইন অনুসারে প্রতিটি আইজিডব্লিউ তাদের রাজস্বের ৪০ শতাংশ বিটিআরসি, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ আইসিএক্স এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এএনএসের কাছে পরিশোধে দায়বদ্ধ। কিন্তু বিটিআরসির চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট অইজিডব্লিউর কাছে রাজস্ব সরাসরি না নিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিতে সম্মতি দেন। বর্তমান কল ভলিউম অনুসারে প্রতি মাসে লেনদেন হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি টাকা ওই বিতর্কিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নেওয়ায় সম্মতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এ টাকা লোপাটের আশঙ্কাও করেছেন।

প্রস্তাবিত মডেলে টায়ার-১ ও টায়ার-২-এর রাজস্ব বণ্টনের হার ধরা হয়েছে ১:১.৯০। একই ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সিন্ডিকেটকে প্রায় দ্বিগুণ আর্থিক লাভ করার প্রস্তাবে সিন্ডিকেটকে শুধু আর্থিক লাভবানই করবে না, অন্য অপারেটরদের পথে বসিয়ে দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

বর্তমান কল ভলিউম অনুসারে প্রতি মাসে সিন্ডিকেটের (টায়ার-২) প্রতি অপারেটর প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা পাবে। অবশ্য প্রস্তাবিত মডেলে আইজিডব্লিউর রাজস্ব আহরণে প্রতি মাসে ৩ মিলিয়ন কল আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেহেতু টায়ার-২ দ্বিগুণ রাজস্ব পায়, সেহেতু তারা ডিসকাউন্টে কল আনবে। অন্যদিকে বিদেশি ক্যারিয়ারগুলো সিন্ডিকেটের ৭ অপারেটর ছাড়া অন্যদের কল দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে সিন্ডিকেটের বাইরের ১৬টি অপারেটরের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

লতিফ সিদ্দিকীর সিন্ডিকেট মার্কেট ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্সের (ওয়াই) নামে বড় অঙ্কের টাকা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। অবশ্য প্রস্তাবিত মডেলে অর্থের অঙ্কটি আপাতত গোপন রাখা হয়েছে। জানা গেছে, আইজিডব্লিউর অর্জিত রাজস্বের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৭ শতাংশ। এতে প্রতি মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকা হয়। আর কলরেট যদি ২ সেন্টের ওপরে নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মার্কেট ডেভেলপমেন্টের নামে লোপাটের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। আর এর বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম।

লতিফ সিদ্দিকী বিদেশ যাওয়ার আগে বিটিআরসির বিতর্কিত মডেলটি অনুমোদনের জন্য তাড়াহুড়া করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সাধারণত কোনো পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য যেসব মৌলিক ধারা ও আইনি বাধা রয়েছে, তা সংশোধনের জন্য প্রস্তাবনার অনুমোদনও চাওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইজিডব্লিউ ব্যবসায় সরকার একটি বড় পক্ষ। এ খাত থেকে ৪০ শতাংশ রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়। উদ্যোক্তারা ২০ শতাংশ রাজস্ব অর্জনে যেখানে মেধা, অর্থ বিনিয়োগ, ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন সেখানে সরকারকে সুষ্ঠু পরিবেশ, বাজার উন্নয়ন, নিরাপত্তা দেওয়া দরকার।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যে খাত থেকে সরকার বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পায় সে খাতের উন্নয়নে কোনো সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। সিন্ডিকেটের প্রস্তাবিত মডেল বাস্তবায়িত হলে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষজ্ঞদের মতে, সিন্ডিকেট মডেলে বাস্তবায়িত হলে আইজিডব্লিউ ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্যই বাড়বে না, সরকারের রাজস্ব হারানো ছাড়াও টেলিকম সেক্টরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এছাড়া বিটিআরসির প্রদত্ত আইজিডব্লিও লাইসেন্সিং ও গাইড লাইন এবং আইএলডিটিএস নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজস্ব ফাঁকি এড়াতে এবং কোম্পানিগুলোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিতে নতুন কোনো মডেল বা আইন প্রয়োজন নেই। বিটিআরসির ওপর অর্পিত ক্ষমতা সঠিক এবং সময়মাফিক প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যা সহজেই সমাধান করা যেতে পারে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন