জেনারেল মোবাইল সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে চান ইরাম

0

মিরাজুল ইসলাম জীবন, টেকজুম ডটটিভি// জেনারেল মোবাইল গুগলের সাথে পার্টনারশিপ হিসেবে কাজ করে। এটি সম্পূর্ণ গুগলের ফোন এবং এর সিস্টেমও গুগল। অ্যান্ড্রয়েড ওয়ান প্রজেক্ট গুগলের। জেনারেল মোবাইলের সফটওয়্যার গুগল টিম সাপোর্টেড। আইফোনের বডি এবং জেনারেল মোবাইলের বডি একই কম্পানি প্রস্তুত করে থাকে। এর প্রত্যকটি পার্টস বিশ্বের নামকরা কম্পানিগুলোর সাপোর্টেড। এটি একটি কোয়ালিটি মোবাইল ফোন।

টেকজুমটিভির সঙ্গে একান্ত আলাপে এ কথা বলেন জেনারেল মোবাইল বাংলাদেশের স্ট্যাটেজিক প্ল্যানিংয়ের প্রধান ইহতেশাম হোসেন ইরাম।

ইহতেশাম হোসেন ইরাম জানান, টার্কিতে (তুরস্ক) জেনারেল মোবাইলকে বলা হয় টার্কিস জায়ান্ট। আমাদের দেশের মতো টার্কিতেও অনেক টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান আছে। জেনারেল মোবাইল গুগলের সাথে মিলে জেনারেল মোবাইল অ্যান্ড্রয়েড ওয়ান ফোন প্রস্তুত করে। অ্যান্ড্রয়েড ওয়ান মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে টার্গেট করে বানানো হয়েছে। এটি সারাবিশ্বে ব্যাপক পরিচিত হলেও এশিয়াতে অপরিচিত। তাই আমরা এই ব্র্যান্ডটিকে বাংলাদেশে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানের দারাজডটকমডটবিডির প্রধান কার্যালয়ে জেনারেল মোবাইল বাংলাদেশে শুরু থেকে বর্তমান হালচাল নিয়ে টেকজুমটিভির সাথে বিস্তারিত কথা বলেন ইহতেসাম হোসাইন। আলাপের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

টেকজুমটিভি : দেশে জেনারেল মোবাইলের শুরুটা কীভাবে?

ইহতেশাম হোসেন : জেনারেল মোবাইল একটি আমেরিকান কম্পানি, যা পরবর্তীতে একটি টার্কিস কম্পানি কিনে নেয়। জেনারেল মোবাইল যখন আমেরিকাতে ব্যাবসা করত তখন টার্কিস প্রতিষ্ঠানটি জয়েন্ট ভেঞ্চারে এর সাথে মোবাইল ফোনের ব্যবসা করত। যখন আমেরিকান কম্পানিটি এই প্রতিষ্ঠান বিক্রির ঘোষণা দেয় তখন টার্কিস কম্পানিটি কিনে এটি কিনে পুরো সেটআপ টার্কিতে নিয়ে যায় এবং সেখানেই এখন তাদের পুরো সেটআপ।

জেনারেল মোবাইল প্রথমে চায়না প্রস্তুত করত এবং তা আমেরিকায় বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমানে এটি টার্কিতে তাদের নিজেদের ফ্যাক্টরিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়। তাই জেনারেল মোবাইল কোনো চাইনিজ মোবাইল না, এটা অরিজিনিয়াল টার্কিস ফোন। জেনারেল মোবাইল টার্কির সবচেয়ে বড় মোবাইল কম্পানি, যা বর্তমানে এক নম্বর পজিশনে আছে। উজবেকিস্তান হচ্ছে জেনারেল মোবাইলের একটি বড় ডিস্ট্রিবিউটার পার্টনার।

টেকজুমটিভি : জেনারেল মোবাইল দেশে আনার প্রক্রিয়াটা কেমন?

ইহতেশাম হোসেন : বাংলাদেশের বাজারে মোবাইল দুই পথে আসে। একটি বৈধ, আরেকটি অবৈধ। বাংলাদেশে অবৈধ পথে প্রচুর ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য আসে। যদিও সরকার এর দিকে লক্ষ্য রাখছে, তবে আমরা জানি বাংলাদেশের মত একটি দেশে এত বড় ইলেক্ট্রনিক্স বাজার মনিটরিং করা সহজ নয়। তাই বাজারে যেহেতু বৈধ ও অবৈধের প্রতিযোগিতা চলছে, সেক্ষেত্রে আমাদের জেনারেল মোবাইল বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত একদম বৈধ এবং বিটিআরসির অনুমতিপ্রাপ্ত একটি ফোন। আমরা যত ফোন আমদানি করছি এর সব তথ্য বিটিআরসিকে জমা দিতে হয়। জেনারেল মোবাইলের সব ধরণের যন্ত্রাংশ, এমনকি ছোট একটি চিপ পর্যন্ত বিটিআরসি পাঁচটি ধাপে পরীক্ষা করে থাকে। এমনকি তারা আমাদের ফোন খুলে দেখে। পুরো রিপোর্ট চেক করে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে অনুমতিপত্র দেয়। এরপরে মোবাইলটা বাজারে ছাড়া হয়।

টেকজুমটিভি : ক্রেতারা তো হাতে নিয়ে না দেখে ফোনটা কিনতে চাইবে না। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

ইহতেশাম হোসেন : কিছু ক্ষেত্রে না দেখে ফোন কেনাও যায় না। এজন্য আমরা এই ফোন কি, তা যাতে কাস্টমাররা এক্সপেরিয়েন্স করতে পারেন সেজন্য ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নয়টি সার্ভিস সেন্টার চালু করেছি। এখানে গিয়ে কাস্টমাররা নিজেরা গিয়ে এই ফোন সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য জানতে পারবেন, দেখতে পারবেন। আমাদের দেশে বিশটি হাব আছে। তারা চাইলে এইসব হাবে গিয়েও তথ্য সংগ্রহ এবং ফোন যাচাই করতে পারেন। এটি যেহেতু একটি পরিচিত ফোন, তাই গ্রাহকরা ইউটিউবে এর টেইলর দেখেও এটি ক্রয় করতে পারবেন।

টেকজুমটিভি : অালাদা প্লাটফর্মে না গিয়ে দারাজের সাথে অনলাইনে মোবাইল ব্যবস্যা করছেন। কিন্তু কেন?

ইহতেশাম হোসেন : বাংলাদেশে কাস্টমাররা ভালো মানের মোবাইল ফোন পাচ্ছে না। ই-কমার্স শুরুর পর থেকে আমাদের লক্ষ্য ছিল নাম্বার ওয়ান ক্যাটেগরির মোবাইল বাজারে আনা। কারণ, মোবাইলের প্রতি অফিসিয়ালি আমাদের একটা ফোকাস ছিল। আমাদের মার্কেট ফিল্ডের ৫০ শতাংশ আমরা সব সময় মোবাইল দেখতাম, এখনও দেখি। বাংলাদশে ভাল মানের মোবাইল ফোনের সংকট ব্যাপক কারণ আমরা তা বিদেশ থেকে আনছি না। তা আনছে আমাদের সেলার বা বিক্রেতারা। তারা যদি কোয়ালিটি মেইন্টেন না করে তাহলে কাস্টমাররা আমাদের দোষারোপ করে। কারণ আমরা যেহেতু মোবাইলটি বিক্রি করছি। আমরা যেহেতু মোবাইল আমদানি করি না, সেহেতু কেন আমরা দোষের ভাগিদার হবো? তাই ঠিক করেছি, আমরা নিজেরাই মোবাইল ফোন আমদানি করবো। এজন্য আমরা এক বছরের একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করি এবং বিভিন্ন মোবাইল কম্পানির সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে জেনারেল মোবাইল ফোনের একটি লিংকের খোঁজ পাই, যা একটি টার্কিস কম্পানি। দারাজ পাকিস্তান সবচেয়ে বড় একটি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এবং তারপর বাংলাদেশ। জেনারেল মোবাইল এই দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় তাদের ফোন এশিয়ার বাজারে বিক্রি করার জন্য।

টেকজুমটিভি : বাজারে আপনাদের মার্কেট শেয়ারিংয়ে অবস্থান কেমন?

ইহতেশাম হোসেন : ই-কমার্স ব্যবসায় মার্কেট শেয়ারিংয়ের বিষয়টা নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। যেমন, বাজারে গ্রামীণফোন বা রবি বা বাংলালিংকের এত শেয়ার আছে। যখন ই-কমার্সের সাথে যুক্ত হয়ে আমরা ব্যবসা করার জন্য ওয়েবসাইট চালু করি তখন প্রচুর ডিসকাউন্ট দিয়ে দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। একটি পণ্য কাস্টমারদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে আমরা প্রচুর ইনভেস্ট করি। ই-কমার্সে বাজার ধরা হয় এর উপর কি পরিমাণ ইনভেস্ট করা হয়েছে তার উপর। ই-কমার্স ব্যবসা রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মত ইনভেস্টমেন্ট-ভিত্তিক ব্যবসা। একটা সময় ইনভেস্ট করে তারপর ফ্ল্যাট বিক্রি করলে এর আয় দ্বারা যেমন বোঝা যায় ব্যবসার লেভেল। ঠিক তেমনি ই-কমার্স ব্যবসাও তাই। এটা সবাই জানে যে, বাংলাদেশে আমরাই সবচেয়ে বেশি ইনভেস্ট করে ব্যবসা করছি। আমাদের চেয়ে বেশি কেউ করেনি তবুও আমরা বলতে পারব না যে আমাদের শেয়ার কত।

টেকজুমটিভি : বাজারের অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় জেনারেল মোবাইলের দাম কেমন?

ইহতেশাম হোসেন : যেহেতু আমরা এতগুলো প্রসেসের মধ্য দিয়ে এবং বৈধ পথে ফোনটি বাংলাদেশে আনছি তাই এর দাম একটু বেশিই রাখা হয়। কিন্তু কাস্টমাররা এটা বুঝতে চায় না। এর পেছনে আমাদের প্রচুর ইনভেস্ট করা হয়েছে। অন্যরা শুধু চায়না থেকে কিনে এনে বাংলাদেশে বিক্রি করছে। বাজারে ব্র্যান্ডের ফোনগুলো একটু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার পাশের দোকানে একই ফোন ননব্র্যান্ড কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরকার তার দিকে নজর দিচ্ছে না। ছয় মাস পরপর মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে হয়ত কিছু জরিমানা করছে কিন্তু এতে যারা ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি করছে তারা ব্যবসায় লোকসান গুণছে। একটি অবৈধ পণ্য কাস্টমার কম দামে পাচ্ছে, তাই বৈধ পণ্য ব্র্যান্ডের হলেও ক্রেতা তা বেশি দাম দিয়ে কিনতে চায় না। এর জন্য আমরা প্রচুর লোকসান গুণছি।

টেকজুমটিভি : জেনারেল মোবাইলের বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে কিছু বলুন।

ইহতেশাম হোসেন : জেনারেল মোবাইল লঞ্চ করার আগে আমরা যে নয়টি সার্ভিস সেন্টার চালু করেছি সেখানে একজন ইঞ্জিনিয়ারসহ কাস্টমার কেয়ার এবং সার্ভিস সেন্টার আছে। প্রত্যেক সেন্টারে পাঁচজন করে নয়টি সেন্টারে ৫০ জন লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফোন লঞ্চ হবার দুই মাস আগে থেকে আমরা এর খরচ বহন করছি। আমাদের লিফলেটে এই সেন্টারগুলোর লোকেশন দেয়া আছে। নয়টির মধ্যে দুইটি ঢাকায় এবং বাকিগুলো ঢাকার বাইরে।

টার্কিতে জেনারেল মোবাইলের একটি পলিসি আছে। তারা একটি মোবাইল সার্ভিস করতে এক ঘন্টা সময় নেয়। ফোনের যেকোনো সমস্যা এক ঘন্টার মধ্যে সমাধান করে কাস্টমারকে বুঝিয়ে দেয়। আমরাও বাংলাদেশে এই সার্ভিস চালু করব। টার্কিতে এটি করতে তিন বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু আমরা আগামী বছর এই সার্ভিস চালু করব। যদি এক ঘন্টায় না হয়, তাহলে কাস্টমারের কাছ থেকে সময় বেশি চেয়ে নিতে হবে। তবে এই সময় হবে সর্বোচ্চ একদিন। যদি ফোন পুরো নষ্ট হয় আর ওয়ারেন্টি থাকে তাহলে আমরা মোবাইল বদলে নতুন ফোন দিয়ে দেব।

যদি মফস্বলের কেউ আমাদের ফোন কিনে এবং এর কোনো সমস্যা থাকে তাহলে সে আমাদের সার্ভিস সেন্টার থেকে সার্ভিস নিতে পারবে অথবা কুরিযার করে ফোন সার্ভিস সেন্টারে পাঠাতে পারবে। এছাড়া দারাজ সেন্টার এবং কাস্টমার কেয়ার আছে। যদি এর দ্বারা কোনো সমাধান না হয় তাহলে আমাদের একটি ইস্যু রেজুলেশন টিম আছে তাদের জানাতে হবে আমার ফোনের এই সমস্যা। এই টিমের কাজ হচ্ছে যেকোন মূল্যে এর সমাধান করা। তবে এর জন্য তাদের পলিসি আছে। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান না হয় তবে কাস্টমারকে জানাতে হবে এবং সময় বাড়িয়ে নিতে হবে। এব্যাপারে আমাদের তিনটি টিম কাজ করে, আফটার সেলস সার্ভিস, কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস এবং ইস্যু রেজুলেশন টিম। এছাড়াও আমাদের অভিযোগ করার জন্য ফেসবুক, ই-মেইল এবং হটলাইন আছে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমরা জেনারেল মোবাইল থেকে প্রচুর স্পেয়ার পার্টস কিনে নিয়েছি। যাতে ভবিষ্যতে কোন ফোনের পার্টস নষ্ট হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করে নতুন পার্টস লাগিয়ে কাস্টমারকে সার্ভিস দিতে পারি।

টেকজুমটিভি : আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা কী?

ইহতেশাম হোসেন : ইতোমধ্যেই ফোরজি লঞ্চ হয়েছে। তাই আমরা ফোরজি সাপোর্টেড জেনারেল মোবাইল বাজারে আনছি। এই মোবাইলে থাকছে ৩ জিবি র‌্যাম। এর দাম মাত্র ১৪ হাজার টাকা।

তাছাড়া আমরা শুধু একটি ব্র্যান্ডের ফোনে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। বাংলাদেশে অফিসিয়ালি ওয়ান প্লাস ফোন বিক্রি হয় না। কিন্তু আমরা এ ধরণের ফোন অফিসিয়ালি বিক্রি করতে চাই। সেইসাথে আমরা ‘দারাজ’ নামে একটি ফিচার ফোন বাজারে আনতে চাই। এব্যাপারে কাজ চলছে, যার নাম হবে ‘দারাজ’ ব্র্যান্ডের মোবাইল। আগামী তিন/চার মাসের মধ্যে এর কাজ শুরু হবে। দারাজ ফিচার ফোনের পাশাপাশি স্মার্টফোন লঞ্চ করার প্লান আছে।

আমরা প্রথমে ফিচার ফোন দিয়ে শুরু করব। আমাদের লক্ষ্য মফস্বল শহর এবং পাড়াগাঁয়ের গ্রাহকদের ডিজিটাল বাংলাদেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। দারাজ ফিচার ফোনের পাশাপাশি স্মার্টফোন লঞ্চ করার প্লান আছে। আর সরকার যদি আমাদের জেনারেল মোবাইল আমদানি করার অনুমতি দেয় তাহলে সব মোবাইল সরাসরি টার্কি থেকে আমদানি করব।
টেকজুমটিভি/ এমআইজে /এসএ

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন