সড়কেই নিভে যায় হাজারো প্রাণ

0

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় হাজারো মানুষের। ঈদ এলে যেন দুর্ঘটনার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এতে একটি প্রাণ গেলেও ক্ষতি হয়ে যায় গোটা একটা পরিবাবের। চালকের অসাবধানতা আর সড়কগুলোর অবকাঠামোগত ত্রুটি এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার স্বরূপ খোঁজার চেষ্টা করেছেন আখতারুজ্জামান সোহাগ ও সাইমুম সাদ

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “যেসব জায়গায় দুর্ঘটনা বেশি হয়, তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ জায়গায় এই দুর্ঘটনাগুলো হয় ভুলভাবে রাস্তা বানানোর জন্য। এককথায় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ত্রুটির জন্য।”

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে (২০০৬-১১) দেশে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮ হাজার ৫৮০টি। এ ছাড়া সারা দেশে প্রতিনিয়ত আরো অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, যা প্রশাসনের নজর পর্যন্ত পৌঁছে না। এসবের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এমন অভিমত প্রকাশ করেছে এআরআই কর্তৃপক্ষ।

ঢাকার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা

এআরআইয়ের সূত্র মতে, ঢাকা শহরের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, ইটিভি ভবনের সামনে, বিজয় সরণি, সায়েদাবাদ উল্লেখযোগ্য। এসব জায়গায়ই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সোনারগাঁও, শনির আখরা, শাহবাগ, জসীমউদ্দীন রোড ক্রসিং, জিপিও (গুলিস্তান), শাপলা চত্বর, শেরাটন, মগবাজার, কাজী নজরুল ইসলাম রোড, ইস্কাটন, বিজয় সরণিতেও কমবেশি দুর্ঘটনা ঘটে।

দেশের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা

বাংলাদেশের কোন কোন স্পটে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “সারা দেশের ২০টি স্পটকে ‘ব্ল্যাক লিস্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ জায়গাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। জায়গাগুলো হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের কাঁচপুর ব্রিজ এবং দাউদকান্দি বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-আরিচা রোডসংলগ্ন তিতাস গ্যাস অফিসের আধা কিলোমিটার পরে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেখেরচর বাসস্ট্যান্ড, মাধবপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ১১ কিলোমিটার আগে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের টঙ্গী মার্কেট, শালনা বাজার, ঢাকা-গাজীপুর-জামালপুর রোডের নবীনগর ইন্টারসেকশন, কুরুনীবাজার বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-আরিচা রোডে কাজলা বাসস্ট্যান্ড (পূর্ব ও পশ্চিম), হাটিকুমরুল বাসস্ট্যান্ড, বাঘোপাড়া বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা-রাজশাহী রোডের দুলাই বাজার, বানেশ্বর বাজার, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের উজানচর প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিলোমিটার আগে, ঢাকা-বরিশাল রোডের ইস্ট ইকুরিয়া বাজার বাসস্ট্যান্ড, আবদুল্লাপুর বাজার বাসস্ট্যান্ড, পশ্চিমে আড়িয়াল খাঁ ফেরিঘাট ও মালিগ্রাম বাসস্ট্যান্ড।”

দুর্ঘটনার কারণ

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন চালানো। এ ছাড়া বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত ওজন নিয়ে গাড়ি চালালেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তা ছাড়া অনেক সময় অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক রাস্তা, পথচারীদের অসতর্কতা, চালকদের পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের অভাব ও ট্রাফিক আইন না মানার কারণে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে।

সড়কেই নিভে যায় হাজারো প্রাণ

রাস্তার যথাযথ নকশা, সময়োপযোগী রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার অভাবে রাস্তাগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে।

প্রতিরোধের উপায়

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সবার আগে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর যথাযথ উন্নয়ন করা দরকার। পাশাপাশি সড়ক ও যানবাহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পথচারী, অযান্ত্রিক ও দুই চাকার যান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তায় আলাদা লেন করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পথচারীর জন্য ফুটপাত, সড়কদ্বীপে দাঁড়ানোর জায়গা এবং পারাপারের ব্যবস্থাসহ ট্রাফিক সিগন্যাল ও সড়কবাতি স্থাপন করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সর্বোপরি আইনের শক্ত ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের অন্যতম উপায়।

একটি কেস স্টাডি

২০০৮ সালের ৩১ জুলাই পাজেরো জিপ ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন সচিব প্রাণ হারান। এঁদের মধ্যে ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রাজিয়া বেগম আর বিসিকের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উথুলি-পাটুরিয়া মোড়ের সড়ক দুর্ঘটনাটি সেই সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

এই দুর্ঘটনার কারণগুলো খুঁজতে গিয়ে এআরআই বেশ কয়েকটি ত্রুটি দেখতে পায়। উথুলি-পাটুরিয়া মোড়টি মূলত একটি ‘ণ’ জংশন। বাঁয়ের মোড়টি চলে গেছে আরিচার দিকে আর ডানেরটি পাটুরিয়ার দিকে। অনিয়মিত চলাচলকারী চালকদের জন্য কোনো প্রকার সাইন ছাড়া ওই রাস্তায় চলাচলটা কঠিন ব্যাপার। তো সেখানে কোনো প্রকার দিকনির্দেশনাকারী সাইনবোর্ড ছিল না। তা ছাড়া সেই জংশনে অনেক বেশি বিলবোর্ডও ছিল, যা গাড়ির চালকদের মনোযোগ কেড়ে নিত। গাড়ির আরোহীদের মধ্যে সচিবের দেহরক্ষী আর চালক ছাড়া আর কারো সিটবেল্ট পরা ছিল না। আসলে সেই পাজেরো গাড়িতে পেছনে বসা আরোহীদের জন্য সিটবেল্ট পরার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। আর জংশনটির নকশাগত সমস্যা তো ছিলই। এসব ত্রুটি সমাধানের জন্য এআরআই বেশ কিছু পরামর্শ দেয় সরকারকে। সে অনুযায়ী উথুলি-পাটুরিয়া মোড়ে এখন চালকদের জন্য সতর্কবাণীর সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে। মোড় থেকে দুই দিকে চলে যাওয়া রাস্তাকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে ছোট করে একটি সড়কদ্বীপ। আছে বেশ কিছু ছোট স্পিড ব্রেকারও।

দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে যারা

দুর্ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে। এদের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো, যারা সড়ক উন্নয়ন ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) : ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন গঠন করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নামের এই সংগঠন। নিজের জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্বুদ্ধ করে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো ও ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্গু মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। গত ১৮ বছরের কর্মকাণ্ডে নিসচা এখন একটি সফল সামাজিক আন্দোলনের নাম। দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্যে বিনা মূল্যে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে অর্থ সাহায্য, পঙ্গুত্ববরণকারীদের হুইলচেয়ার বিতরণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া নিসচার কার্যক্রমের অংশ।

অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট : অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে এআরআই। এদের প্রধান কাজ দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণা করা। ২০০২ সালে এআরআইয়ের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৭ সালে স্বতন্ত্র একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে এটি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অন্তর্ভুক্ত হয়। মূলত সারা দেশের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোকে ‘ব্ল্যাক স্পট’ হিসেবে চিহ্নিতকরণ এবং বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলো গবেষণা করে সেসবের কারণ উদ্ঘাটনের কাজ করে থাকে এআরআই। তবে দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গাগুলোতে প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধানও দেয় এআরআই, যা একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গার দুর্ঘটনা অনেকাংশেই হ্রাস করে।

জাইকা : জাইকা মূলত জাপানের একটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা, যারা মূলত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করে। জাইকা বাংলাদেশের সড়ক উন্নয়ন ও নির্মাণের জন্য সরকারের হাতে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে। ঋণ ছাড়াও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিয়ে থাকে জাইকা।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন