রবি’র বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান করবে দুদক

0

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে নানা কৌশলে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে অনুসন্ধানে যাচ্ছে। মূল কোম্পানির নামে বিনিয়োগ এনে সেই টাকায় অবৈধভাবে নতুন কোম্পানি গঠন, রাজস্ব ফাঁকি ও মুদ্রা পাচার, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি, ঘুষ কেলেঙ্কারি, সিম রিপ্লেসমেন্টের নামে নতুন সিম বিক্রিসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান করবে দুদক। শিগগিরই অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে বলে নিশ্চিত করেছে দুদক সূত্র।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহৎ মোবাইল কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড আরও চারটি কোম্পানি খুলে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কোম্পানিটি হল ‘ই-ডটকো’। এর মালিকানা রবির মূল কোম্পানি মালয়েশিয়ার আজিয়াটা গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তিদের। বর্তমানে রবি এই খাত থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করলেও সেই টাকা মূল কোম্পানির অ্যাকাউন্টে যোগ না করে প্রতি মাসে শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

বিটিআরসির সঙ্গে যোগসাজশে রবি বলার চেষ্টা করছে, ই-ডটকো একটি বাংলাদেশী কোম্পানি। রবি তাদের মাধ্যমে আউটসোর্সিং করে তাদের নেটওয়ার্ক ডিভিশন চালাচ্ছে। কিন্তু এনবিআর বলছে ‘ই-ডটকোর’ আয় করা টাকা অবৈধভাবে বিদেশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। কারণ ই-ডটকোর বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডারই বিদেশী।

সূত্র আরও জানায়, তরঙ্গ চার্জের নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে রবি আজিয়াটা।১৫ বছর আগে একটেল নামে ব্যবসা শুরু করে আজিয়াটা গ্রুপ। শুরুতে তারা ১৭ দশমিক ৮ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি (তরঙ্গ) নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও কোনো তরঙ্গ চার্জ দেয়নি। ওই সময় নানাভাবে তৎকালীন একটেলের কাছে ফ্রিকোয়েন্সি ফি চাওয়া হলেও নীতিমালা না থাকার অজুহাতে এই তরঙ্গ চার্জ দেয়নি তারা। আর এভাবে ১১ বছর একটেল সর্বনিম্ন ১ হাজার কোটি টাকার এই প্রাকৃতিক সম্পদ বিনা পয়সায় ব্যবহার করেছে। পরবর্তীতে বিটিআরসি কিছুটা কঠোর অবস্থানে গেলে চাপের মুখে ২০০৮ সালে মাত্র ৫ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি কিনে তারা। যা থেকে সরকার ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা আয় করে।

অথচ সে আমলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ তরঙ্গ বিক্রি করে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। দেখা গেছে ভারত ওই সময় প্রতি মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি বিক্রি করে আয় করেছিল ১১ কোটি ৩০ লাখ রুপি। আর বিটিআরসির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সরকারকে এ বিরাট অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে তারা। যদিও সে সময় ১ টাকার কল মিনিট বিক্রি করেছে ৭-৮ টাকায়।

বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী- তারপরও রবিসহ অন্যান্য অপারেটরের নামে অবিক্রিত ফ্রিকোয়েন্সি থেকে যায় ৬৫ মেগাহার্টজ। এই অবিক্রিত ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে রবির কাছে ছিল ১২.৬ মেগাহার্টজ। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী এর দামও ছিল প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। যা আজো অনাদায়যোগ্য এবং আত্মসাৎকৃত।

দুদক সূত্র আরও জানায়, সিম রিপ্লেসমেন্টের নামেও ৬৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে রবি। ২০০৭ সালের মার্চ থেকে ২০১১-এর জুন পর্যন্তু ৫২ লাখ ৬১ হাজার ৫৪১টি সিম রিপ্লেসমেন্টের নামে নতুন গ্রাহকের কাছে সিম বিক্রি করে এ অর্থ ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশেষ অনুসন্ধান চালিয়ে এ দুর্নীতি খুঁজে পায়। ফাঁকি দেয়া অর্থ জমা দিতে রবিকে চিঠি দিয়ে তাগিদ দিয়েছে এনবিআর। কয়েক দফা চিঠি চালাচালির পরও এনবিআরিকে টাকা পরিশো্ধ করেনি তারা।

এ বিষয়ে এক আর্থিক প্রতিবেদনে আজিয়াটা জানিয়েছে, গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ৬৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা কর ফাঁকির অভিযোগে রবিকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেয়। যৌক্তিক কারণ ব্যখ্যা করতে ব্যর্থ হলে সরকারি কোষাগারে এ অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয় ওই নোটিশে।

এর বাইরে রবির বিরুদ্ধে বেশি বিনিযোগ করে বিনিয়োগ বোর্ডকে কম দেখিয়ে কয়েক শ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া মিথ্যা ঘোষণা এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আমদানি করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে শুল্ক বিভাগের।

এ বিষয়ে রবির মিডিয়া রিলেশন বিভাগের ম্যানেজার আশিকুর রহমান জানান, তরঙ্গ চার্জের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। রবি যখন ফ্রি তরঙ্গ ব্যবহার করেছে তখন সব মোবাইল অপারেটরই এ সুযোগ নিয়েছে। এখানে রবির বিরুদ্ধে আলাদা কোনো অভিযোগ বিটিআরসির পক্ষ থেকে তোলা হয়নি। আর সিম রিপ্লেসমেন্টের বিষয়টিতে এনবিআরের সাথে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। এ বিষয়টি সমাধানের জন্য বৃহৎ করদাতা ইউনিট ও এমটেব এর সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি রয়েছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো যাবে বলে আশিকুর রহমান জানান।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন