চোরাই পণ্যের বিক্রয় হচ্ছে বিক্রয় ডটকমে

0

তারিকুল হাসান আশিক// বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের বিবিএ’র ছাত্র ফয়সাল মোহাম্মদ শান। শ্যামলীর বাসা থেকে ঝিগাতলায় ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য একটা সাইকেল কিনেছিল। সেটা চালিয়ে মাঝে-মধ্যে বন্ধু ও আত্মীয়ের বাসায়ও আসা-যাওয়া করতো। একদিন তার সেই মহা প্রয়োজনীয় সাইকেলটি চুরি হয়ে যায়। তারপরের গল্পটা এ রকম- বিক্রয় ডটকম-এ একটি সাইকেলের বিজ্ঞাপন দেখে শান। যোগাযোগ করে বিক্রেতার সঙ্গে। ২-৩ জন বন্ধুসহ মিরপুরের পল্লবীতে যায় সাইকেলটা দেখতে। দাম জানতে চায়। দাম শুনে কিছু বলে না। স্বাভাবিকভাবে জানতে চায়- সাইকেলের বেলের উপরের অংশটা কোথায়? সাইকেলের বিজ্ঞাপনদাতা ছেলেটা বলে- হারিয়ে ফেলেছে। শান কিছু না বলে পকেট থেকে বেলের উপরের অংশটা ছেলেটার সামনে ধরে। সত্যিটা হলো, সাইকেলের ছবি দেখেই শান চিনতে পেরেছিল এটা তার চুরি হওয়া সাইকেল। বেলের উপরের অংশ লুজ ছিল বলে সেটা বাসায় খুলে রেখেছিল। বিক্রেতা হা করে তাকিয়ে থাকে। শান ও তার বন্ধুরা সাইকেলটা নিয়ে চলে আসে।

শান চালাক ও একইসঙ্গে ভাগ্যবান। হারানো জিনিস উদ্ধার করেছে। কিন্তু সবাই তার মতো ভাগ্যবান নয়। যেমন তার পাশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইইউ’র ছাত্র মোহাম্মদ শাহীন। নতুন মোটর সাইকেলের দাম অনেক বেশি হওয়ায় সেকেন্ডহ্যান্ড মোটরসাইকেল কিনতে দ্বারস্থ হয়েছিল বিক্রয় ডটকমের। জমানো টাকার পাশাপাশি নানা জায়গা থেকে ধার করে পরিচিত অভিজ্ঞ লোক সঙ্গে নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ টাকায় কিনে ফেলে পালসার মোটরবাইক।

মাস দুয়েক পার হতে না হতেই এক দিন আটকালো পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তা বললেন বাইকটি চোরাই এবং কাগজপত্র সবই নকল। শেষে বাইক নিয়ে যাওয়া হলো তেজগাঁও থানায়। শুরু হল ভোগান্তি। যার কাছ থেকে বাইক কেনা হয়েছে তার হদিস নেই। ফোন একবার খোলা তো আরেকবার বন্ধ। শেষে ফোন ধরে বিক্রেতা বললেন তিনি বাইক নিয়ে টাকা ফেরত দেবেন। শেষে একে ধরে, ওকে ধরে পুলিশকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়ানো হল বাইক। বিক্রেতা বাইকটি ফেরত নিলেও দিয়েছে ৮০ হাজার টাকা। বাকি ৭০ হাজার টাকার জন্য শাহীনকে ঘুরতে হচ্ছে আজও।

শাহীন আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাইক কিনতে বিক্রয় ডটকম, এখানেই ডটকমসহ সব সাইটের বিজ্ঞাপন দেখে যেখানে যোগাযোগ করেছি তাদের অধিকাংশই অবৈধ পেয়েছি। বৈধ কাগজ ভেবে শেষমেশ যেটা কিনেছি সেটাও অবৈধ!’

এ রকম শত প্রতারণা আর অবৈধ, চোরাই পণ্য বিক্রির নতুন প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে বিক্রয় ডটকমসহ কেনাবেচার সাইটগুলো। বিজ্ঞাপন পোস্ট করার ক্ষেত্রে যেসব বিধি নিষেধ রয়েছে তার তোয়াক্কা না করে এসব সাইটগুলোর মাধ্যমে নানা অবৈধ এবং চুরি করা পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে নানা প্রতারকচক্রও তাদের চোরাই ও অবৈধ পণ্য সহজে বিক্রয় করতে দ্বারস্থ হচ্ছে এসব ওয়েবসাইটের।

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ‘সল্টসাইট টেকনোলজিস এবি’ কর্তৃক পরিচালিত সুইডেনভিত্তিক বাংলাদেশি অনলাইন পণ্য কেনাবেচার ওয়েবসাইট ‘বিক্রয় ডটকম’। সাইটে গিয়ে দেখা যায় নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এখানে নানা রকম অবৈধ পণ্য ও পশুপাখি ক্রয় বিক্রয়ের সচিত্র বিজ্ঞাপন (যা আইনত নিষিদ্ধ)। এগুলো সব বিক্রয় ডটকমের ‘ম্যানুয়ালি রিভিউ’ অর্থাৎ যাচাই সাপেক্ষে পোস্ট করার কথা। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে- রিভিউ করা হলে বিজ্ঞাপনগুলো প্রকাশ হয়েছে কী করে!

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর নবম অধ্যায়ে বন্যপ্রাণী বিক্রির দণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:

“(খ) লাইসেন্স অথবা পারমিট প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কাহারো নিকট হইতে কোন বন্যপ্রাণী, বন্যপ্রাণীর কোন অংশ, মাংস, ট্রফি অথবা উহা হইতে উৎপন্ন দ্রব্য বা বনজদ্রব্য বা তফসিল ৪ এ উল্লিখিত উদ্ভিদ অথবা উহা হইতে উৎপন্ন দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় বা আমদানি-রপ্তানি করেন- তাহা হইলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ১ (এক) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাইলে সর্বোচ্চ ৩ (তিন) বৎসর পর্যন্ত করাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ (দুই) লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শফিকুর রহমান বলেন, যদিও দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব পশুপাখি বিক্রয় করা হচ্ছে কিন্তু বিক্রয় ডটকমে জীবজন্তু বিক্রয়ের জন্য একটি বিশেষ পেইজ-ই খোলা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে তারা আইনের তোয়াক্কা করছে না। অথচ বাংলাদেশি আইনে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিক্রয় ডটকমের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে অনেকে থানায় যান। কিন্তু কার বিরুদ্ধে মামলা করবে বা বিক্রয় ডটকম-এর অস্তিত্ব কোথায় এ নিয়ে ঝামেলায় পড়ে থানার কর্মকর্তা ও অভিযোগকারীরা। কারণ প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কোনও ঠিকানা ওয়েবসাইটে উল্লেখ নেই। শুধু মেসেজ পাঠানোর ব্যবস্থা আছে এবং একটি ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে গ্রাহককে কোনও তথ্যও দেওয়া হয় না।

জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম জানান, এসব ভার্চুয়াল হাটকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠছে বেশ কিছু প্রতারক চক্র। তারা ছিনতাই করা ও অবৈধ পণ্য বিক্রয়ের সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে এসব ওয়েবসাইটগুলোকে। অন্যদিকে কালোবাজারিরাও এগুলোকে ব্যবহার করছে প্রতিনিয়ত।

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি এসব ক্ষেত্রে প্রতারকরা যেসব ইমেইল বা মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে, পণ্য বিক্রি হলে সেটা বন্ধ করে দেয়। অনেকে চোরাই পণ্য কম দামে কিনে প্রতারিত হওয়ার পরও পুলিশের সাহায্য নিতে আসে না। যারা আসে তারাও ক্রেতার ডিটেইলস দিতে পারে না বলে মামলা হয় না।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও ভারত সিরিজের ওয়ানডে ম্যাচের টিকিট নিয়ে হুলস্থূল কাণ্ড চলেছে। লাইনে দাঁড়িয়েও যখন টিকিট পাচ্ছে না অনেকে, তখন কালোবাজারিরা টিকিট চড়ামূল্যে বিক্রয়ের জন্যে ব্যবহার করেছে বিক্রয় ডট কম। ৫০ টাকার টিকিট ৫০০ টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা গেছে তাতে। যা অবৈধ ও আইনত দণ্ডনীয়।

যত্রতত্র ও কাগজপত্র ছাড়া মোবাইল ফোনের সিমকার্ড ক্রয়বিক্রয় নিষিদ্ধ হলেও বিক্রয় ডটকমে মিলছে বিভিন্ন অপারেটরের ‘স্পেশাল’ সিমকার্ড অর্থাৎ বিশেষ নাম্বারের সিমকার্ড।

স্নাতকপড়ুয়া বাপ্পী গত মাসে ৫ হাজার টাকায় ‘এখানেই’ ডটকম ওয়েবসাইট থেকে একটি ১৯ ইঞ্চি এলইডি মনিটর কিনেছিলেন রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে। সব কিছু ঠিকঠাক দেখে বাসায় নিয়ে এসে দেখলেন মনিটরটি ৫ মিনিট পর পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যার কাছ থেকে মনিটরটি কিনেছিলেন তার ফোন নাম্বারও বন্ধ। পরদিন বাপ্পি বিক্রেতার ঠিকানায় গিয়ে দেখে লোকটি বাসা ছেড়ে চলে গেছে।

বিক্রয় ডটকমের মূল প্রতিষ্ঠান সল্টসাইট টেকনোলজিস এবি (Saltside Technologies AB)-এর দাবি তাদের ব্যবসা রয়েছে দুবাই, শ্রীলংকা নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে বাংলাদেশে বিক্রয় ডটকমের শতাধিক কর্মী কাজ করছেন। সাইট ব্যবহারের শর্তাবলীতে বলা হয়েছে :

“Bikroy.com সুইডেনের আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। বিজ্ঞাপনদাতা এবং ব্যবহারকারীগণ এই মর্মে সম্মত হন যে, Bikroy.com ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো ধরনের বিরোধ বা দাবির উপর প্রথম অনুরোধের আদালত হিসেবে সুইডেনের আদালতের সাথে গথেনবার্গের ডিসট্রিক্ট কোর্টের এখতিয়ার থাকবে।”

বাংলাদেশে পরিচালিত কোনও ব্যবসা কেন সুইডিস আইনে নিয়ন্ত্রিত হবে এ নিয়েও কোনও জবাব পাওয়া যাচ্ছে না তাদের তরফ থেকে।

বিক্রয় ডটকম-এর দেওয়া কাস্টমার সার্ভিস নাম্বারে ফোন করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় কোথায় বা কারা এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন জানতে চাইলে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। নানাভাবে চেষ্টা করেও তাদের ব্যবসায়িক কার্যকলাপ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার পরিচয় দানকারী ব্যক্তি। অন্যদিকে তাদের কোম্পানি রাজস্ব বোর্ডে কী নামে নিবন্ধিত আছে তারও কোন সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন টেলিভিশনসহ নানা ওয়েবসাইটেই দেখা যায় তাদের বিজ্ঞাপন। তাদের এই আয়ের উৎস কী তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

বিভিন্ন পণ্য বিক্রির সাইটে এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী উপকমিশনার মো. শাহজাহান বলেন, নিঃসন্দেহে এগুলো অপরাধ। তবে এসব নিয়ে এখনও কেউ আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা পৃথিবীর নানা দেশে একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। এখানেও বিভিন্ন সুপারশপ, অনলাইন কেনাকাটার দোকান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলে এসব সাইটে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। এতে বিক্রেতাদের স্বচ্ছতা তো আসবেই, সচেতন হবে ক্রেতারাও।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন