ইটির খোঁজে আশা নয়া অক্সিজেনে

0

নিউজ ডেস্ক, টেকজুম ডটটিভি// দেশ জুড়ে আতঙ্কের খবর পৌঁছোল সিবিএস বেতার কেন্দ্রে। সর্বনাশ! কর্তাদের মাথায় হাত। আরে, রেডিওতে যা প্রচারিত হচ্ছে, তা তো নাটক! বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক এইচ জি ওয়েলসের লেখা ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্’–এর নাট্যরূপ। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।

৩০ অক্টোবর, ১৯৩৮। আমেরিকায় সিবিএস রেডিও স্টেশনে রাত আটটায় প্রাইম টাইম অনুষ্ঠান। উদ্দাম গান-বাজনা। হঠাৎ থেমে গেল তা। শোনা গেল ঘোষকের কণ্ঠ। পৃথিবীর মানমন্দিরে ধরা পড়েছে মঙ্গলগ্রহে বিস্ফোরণ। কিছু পরে আর এক ঘোষণা। উল্কার মতো কিছু একটা আছড়ে পড়েছে নিউ জার্সি-র গ্রোভার্স মিলস নামে এক জায়গায়।

অল্প পরেই ঘটনাস্থল থেকে সাংবাদিকের ধারাভাষ্য: উল্কা নয়, পড়েছে পেল্লায় এক ধাতব সিলিন্ডার। রকেট। হা ঈশ্বর! সেই সিলিন্ডার থেকে নামছে সাপের মতো লম্বাটে জীব। আর একটা। আরও একটা। আরও…। দেখতে সব যেন অক্টোপাসের শুঁড়। বিশাল লম্বা। ওহ্, এমন ঘিনঘিনে চেহারার দিকে তাকালে গা গুলিয়ে উঠছে। কিম্ভূতকিমাকার জীবগুলোর গা চকচকে, চোখে আগুন, ঠোঁটে রক্ত। ওদের দেখতে জড়ো হয়েছে যে হাজার হাজার মানুষ, তাদের আগুন-রশ্মি দিয়ে মেরে ফেলছে ওই জন্তুরা। খবর পেয়ে ছুটে এসেছে ন্যাশনাল গার্ড। তারাও মরছে হাজারে-হাজারে। ওহ্, শ্রোতাবন্ধুরা, এই মাত্র খবর এল, ভয়ঙ্কর ওই জীবেরা নেমেছে শিকাগো ও সেন্ট লুইস শহরেও। ওদের আক্রমণে দিশেহারা গোটা আমেরিকা। চার দিকে পালাও-পালাও রব।

আরও পড়ুন: ফেসবুকে ধরা দিল নতুন পতঙ্গভুক

শুধু রেডিওতে নয়, পালাও-পালাও গোটা আমেরিকায়। তখনও টেলিভিশন আসেনি। রেডিওর স্বর্ণযুগ। প্রাইম টাইমে সিবিএস সম্প্রচার শুনে লাখো লাখো মানুষ রাস্তায়। রেডিও শুনে সবার এক কথা। মঙ্গলগ্রহের জীব নেমেছে পৃথিবীতে। ওরা ধ্বংস করবে এই গ্রহের সব কিছু। পুলিশে ফোন। আগুন-রশ্মি থেকে বাঁচতে গ্যাস মাস্ক দিন। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফোন। লাইন কেটে অন্ধকার করে দিন পথঘাট। জন্তুরা যাতে দেখতে না পায়। চার্চের দরজায় কড়া না়ড়া। প্রার্থনা বন্ধ করে বাড়ি যান সবাই। প্রতীক্ষা করুন মৃত্যুর।

দেশ জুড়ে আতঙ্কের খবর পৌঁছোল সিবিএস বেতার কেন্দ্রে। সর্বনাশ! কর্তাদের মাথায় হাত। আরে, রেডিওতে যা প্রচারিত হচ্ছে, তা তো নাটক! বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক এইচ জি ওয়েলসের লেখা ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্’–এর নাট্যরূপ। তবে কিনা আকর্ষণ বাড়াতে মশলা জুড়ে দেওয়া হয়েছে খানিক। আর তার ঠেলায় দেশ জুড়ে প্রলয়কাণ্ড। নাটক সাময়িক থামিয়ে আমেরিকাবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন কাহিনি ঢেলে সাজার নায়ক অরসন ওয়েলস। অভিনেতা হিসেবে যিনি পরে হলিউড কাঁপাবেন।

সাতাত্তর বছর আগের ওই বেতার-নাটক এখনও আলোচিত হয় সাংবাদিকতার ক্লাসে। গণমাধ্যমের প্রভাব ব্যাখ্যায়। সে অন্য কথা। এখানে অরসন ওয়েলসের কেরামতির প্রসঙ্গ অন্য কারণে। ভিন্গ্রহের জীব পৃথিবীতে এসেছে— এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি আজও। উড়ন্ত চাকি ‘উফো’ এখনও গাঁজাখুরি গপ্পো হিসেবেই গণ্য হয়। ‘ইটি’ যত প্রিয়ই হোক, সে-ও নিছক চলচ্চিত্রের চরিত্র। তবে কল্পের জীব সত্যিই মাটিতে নামলে কী হতে পারে, তার একটা আঁচ মিলেছিল ওই বেতার-নাটক থেকেই। তবু তাদের আসার আশায় না থেকে নতুন উদ্যমে ইটি খুঁজতে নেমেছে ‘সেটি’।

সেটি আবার কী?
পোশাকি নাম ‘সার্চ ফর একস্ট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইনটেলিজেন্স’। আদ্যক্ষরে ‘সেটি’। আপাতত যা খবরের শিরোনামে। এই উদ্যোগে আগামী দশ বছরের জন্য ১০ কোটি ডলার দান করেছেন রুশ ধনকুবের ইউরি মিলনার। বাবা-মা ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রথম মহাকাশচারী আর এক বিখ্যাত রুশ নাগরিক ইউরি গ্যাগারিনের কথা মনে রেখে। কণা- পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক মিলনার প্রচুর অর্থের মালিক হয়েছেন ফেসবুক এবং আরও কিছু উদ্যোগে বিনিয়োগকারী হিসেবে। বিরাট ধনী হয়েও মিলনার মৌলবিজ্ঞানে এখনও কৌতূহলী। ২০১২ সালে চালু করেছেন ৩০ লক্ষ ডলারের ‘ব্রেকথ্রু প্রাইজ’। প্রথম বছরেই যে পুরস্কার পেয়েছিলেন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন।
‘ব্রেকথ্রু প্রাইজ’-এর পর ‘ব্রেকথ্রু লিস্‌ন’। রেডিও টেলিস্কোপে ইটি-দের পাঠানো সংকেতের জন্য কান পেতে থাকার জন্য। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে সভা করে মিলনার সম্প্রতি ওই বিপুল অর্থসাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন ‘সেটি’-র জন্য। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানের বড় বড় তারকা। হ্যাঁ, অবশ্যই

স্টিফেন হকিং-ও। তিনি বলেছেন, ‘‘অসীম এই বিশ্বে অন্য কোথাও প্রাণ নিশ্চয়ই আছে। আছে কি না, এর চেয়ে বড় প্রশ্ন আর কিছু হয় না। জবাব খোঁজার এই তো সময়।’

কিন্তু প্রশ্ন করলেই কি জবাব মেলে! ‘সেটি’ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ৫০ বছরেরও বেশি আগে। কত বার্তাই না গিয়েছে মহাশূন্যে। কোনও সাড়া মেলেনি। ঠাট্টা করে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মি এক বার বলেছিলেন, ‘হোয়ার ইজ এভরিবডি?’ কোথায় তারা? এত খোঁজাখুজি সত্ত্বেও কোনও ইঙ্গিত না মেলায় ‘সেটি’ প্রকল্পে অর্থসাহায্য প্রায় বন্ধের জোগাড় হয়েছিল। বছরে মাত্র ৫ লক্ষ ডলারে কী হয়! যার অনেকটা আবার সাধারণ মানুষের চাঁদা। তার বদলে ১০ কোটি ডলার সাহায্য! স্বাভাবিক ভাবেই উল্লসিত ‘সেটি’ প্রকল্পের বিজ্ঞানী অ্যানড্রু সিমিয়ন। বলেছেন, ‘‘এখন এদিক-সেদিক টেলিস্কোপে চেয়েচিন্তে বছরে মাত্র ২৪-৩৬ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। এর পর বছরে কয়েক হাজার ঘণ্টা কাজের সুযোগ পাব। কত বড় উপকার, বলে শেষ করা যায় না। এ তো বিপ্লব।’’

আরও পড়ুন: ভারতে চালু হচ্ছে সোলার পাওয়ার ওয়াইফাই

ব্রহ্মাণ্ড বিপুল। কত নক্ষত্র! গ্যালাক্সি-ই বা কত। তাদের ভিড়ে খুঁজে চলা। সুতরাং, ইটি যেমন বড় প্রশ্নচিহ্ন, তেমনই তার খোঁজ এক দীর্ঘ প্রচেষ্টাও বটে। খোঁজ না পেয়ে যাঁরা হাল ছেড়ে দিতে চান, তাঁদের উদ্দেশে ইটি-গবেষিকা জিল টারটার (‘কনটাক্ট’ চলচ্চিত্রে নায়িকার চরিত্রটি যার অনুকরণে) বলেছেন, ‘আট আউন্সের গ্লাসে সমুদ্রের জল ভরে তাতে কিছু না পেলে কি ধরে নেবেন, সমুদ্রে একটাও মাছ নেই?’

পৃথিবীতে প্রাণ কি নিঃসঙ্গ? প্রশ্ন তুলে বিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ক জবাব দিয়েছিলেন চমৎকার। বলেছিলেন, ‘কখনও ভাবি আমরা নিঃসঙ্গ, কখনও ভাবি তা নয়। সত্যিটা যা-ই হোক, তা কিন্তু রোমহর্ষক।’

ইটি-র অস্তিত্বের প্রশ্নে এক সময় গভীর মনোযোগী ছিলেন ‘কনটাক্ট’ উপন্যাসের লেখক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান। ‘সেটি’ প্রকল্পকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘দ্য সার্চ ফর হু উই আর।’ এই মহাবিশ্বে মানুষের আসল পরিচয়ের খোঁজ। কে আমরা? কোথা থেকে এলাম? কোথায় যাচ্ছি? প্রতিবেশীর খোঁজ পেলে তবেই নিজেকে ভাল করে চেনা যায়।

ইটি গবেষক জন উলফের কাছে প্রশ্নটা আরও বড়। তাঁর কথায়, ‘ইটি যদি না থাকে, তবে তার তাৎপর্য গভীর। তা হলে প্রমাণ হবে ভগবান বলে আর কেউ কোথাও নেই। আমরাই ভগবান।’

আর এমন একখানা প্রশ্নের সামনে মিলনারের ১০ কোটি ডলারও কম পড়বে না তো! নতুন অক্সিজেন পেয়ে ‘সেটি’র বিজ্ঞানীরা আপাতত সে ভাবনা সরিয়ে রাখতে চান। নতুন উদ্যমে ঝাঁপ দিতে চান কোনও এক দোসরের খোঁজে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন