বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের সফটওয়্যার শিল্প তেমনভাবে বিকশিত হচ্ছে না। প্রায় ৩০ বছর আগে বাংলাদেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও এখনো স্বল্প গণ্ডির মধ্যেই আটকে আছে বিপুল সম্ভাবনা শিল্প। দেশে বর্তমানে মাত্র ৩০৯টি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে ৭ হাজারেরও কম জনবল রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। এদের সম্মিলিত আয় দশ কোটি মার্কিন ডলারেরও কম। এদেশে ৩০ বছর ধরে কমবেশি কিছু প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে বছরে গড়ে মাত্র আড়াই কোটি ডলার মূল্যের সফটওয়্যার রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এবং সস্তা শ্রমের কারণে উন্নত বিশ্বের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। সেদিক থেকে ভারত, কোরিয়া এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত; কিন্তু এ সুযোগটি তেমনভাবে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।

সম্প্রতি সফটওয়্যার শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর সম্ভাবনা নিয়ে এক গবেষণা পরিচালনা করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন। এর খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এদেশের বেশিরভাগ সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল গড়ে ৩০ জনের নিচে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সরাসরি এ খাতের উপর নির্ভরশীল নয়। টিকে থাকার স্বার্থে তাদের অন্যান্য ব্যবসাও করতে হচ্ছে। যেমন সফটওয়্যার তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার ট্রেনিং এবং ইন্টারনেট ভিত্তিক সার্ভিস দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ জনবলের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ নারী রয়েছেন। ২০১০ থেকে গত পাঁচ বছরে এ খাতে জনবল বেড়েছে ৬৬ ভাগ। অর্থাত্ বছরে গড়ে বেড়েছে মাত্র ১৩ ভাগ।

গবেষণায় জানা গেছে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার মধ্যে। জরিপকালে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে তাদের বার্ষিক আয় ৫ কোটি টাকার উপরে। ২০১৪ সালে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান ৫ কোটি টাকার বেশি সফটওয়্যার রফতানি করেছে। গত ৫ বছরে দেশের সফটওয়্যার শিল্প একটু একটু করে এগুচ্ছে; কিন্তু পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এই যাত্রা অনেক ধীরগতির।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, সফটওয়্যার শিল্প বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১০ কোটি ডলার মূল্য সংযোজন করছে, মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। দেশে কর্মরত সফটওয়্যারের সাথে সম্পৃক্ত জনশক্তির প্রতিজন প্রতিবছর সাড়ে বারো হাজার ডলারের মূল্য সংযোজন করছে। সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন করছে মোবাইল এপ্লিকেশন সফটওয়্যার। সফটওয়্যার শিল্পের মোট আয়ের অর্ধেকই আসছে এই খাত থেকে। অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি ই-গভর্নমেন্ট এপ্লিকেশন তৈরিতে কাজ করছে। এছাড়া পে-রোল, ই-কমার্স-এর মতো সফটওয়্যার নির্মাণেও তারা অংশগ্রহণ করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কম্পিউটার সমিতি এবং বেসিস আগামী ৫ বছরে ৫০ হাজার আইটি প্রফেশনাল তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সফটওয়্যার শিল্পে প্রতিযোগিতা করতে হলে এ খাতে আরো দক্ষ শ্রমশক্তির পাশাপাশি দক্ষ পেশাজীবী গড়ে তুলতে হবে।

খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বেশিরভাগ সফটওয়্যার শিল্পে গড়ে মাত্র ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের বিনিয়োগের প্রধান উত্স ব্যাংক লোন। স্বল্প বিনিয়োগ এ শিল্প বিকাশের পথে অন্যতম অন্তরায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের সফটওয়্যার প্রসারে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন ভূমিকা নেই। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপটে তাদের এ খাতে বহু অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশি কোন প্রতিষ্ঠান নামকরা কোন বড় প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার নির্মাণের কাজ পায়নি। এদেশে সফটওয়্যার শিল্পে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই এর পরিমাণও অনেক কম। দুইটি বড় মোবাইল সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাদ দিলে তেমন বড় লগ্নি আসেনি এ খাতে। তবে আশার বিষয় হলো- সুইডেন, জাপান এবং কোরিয়া এ এদেশে সফটওয়্যার শিল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে; কিন্তু বিশেষায়িত অঞ্চল গড়ে না ওঠায় তারা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারছে না।

সফটওয়্যার খাতের আরেকটি সম্ভাবনাময় দিক হলো ‘ফ্রিল্যান্সিং’। এ খাতেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং কাজের সাথে যুক্ত রয়েছে কোটি কোটি তরুণ। সে হিসেবে মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফ্রিল্যান্সিং বাজার এদেশের তরুণদের দখলে রয়েছে। এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্বল্পমূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দ্রুত দেশের প্রতিটি স্থানে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু নীতি সহায়তা এ সেক্টরকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কোরিয়া বাংলাদেশের অনেক পরে এ শিল্পে যুক্ত হয়েছে। সরকারি নীতি সহায়তাই মূলত তাদের এ খাতে বিকাশ লাভের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন তথ্য-প্রযুক্তির সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হলে তারাও এগুতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, এক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই আগামী ৪ বছরে ২৫ কোটি ডলারের সফটওয়্যারের বাজার তৈরি করতে পারে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন