বিদ্যুতের খুঁটিতে থাকা আইএসপিদের ঝুলন্ত তার কাঁটা নিয়ে আইএসপিএবির পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য

0

প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা
রাজধানীর মতিঝিল-দিলকুশা ও ঢাকা শহরের প্রধান সড়কসহ শাখা সড়কসমূহের বৈদ্যুতিক খুঁটি হইতে আগামী ২১ আগস্টের মধ্যে ঝুলন্ত তার অপসারণের জন্য ডিপিডিসি ও ডেসকো সম্প্রতি পত্রিকা মারফত নোটিশ প্রদান করেছে।

ডিপিডিসি ও ডেসকোর এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যাংকিং ও যাবতীয় কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনার প্রতিবাদে আমাদের আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন। আশা করছি আপনারা আপনাদের বহুল প্রচারিত সংবাদ মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে আমাদেরকে বাধিত করবেন।

সাংবাদিক ভাইয়েরা, আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে, সরকার মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন লাইসেন্স (এনটিটিএন) দিয়েছে। কিন্তু তারা আমাদেরকে টেকনিক্যাল সমাধান প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। যার ফলে আইএসপিসমূহ যার যার মতো করে তাদের নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে। এতে হাজার হাজার কিলোমিটার তার রাস্তায় ঝুলানো হয়েছে। শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

এনটিটিএন অপারেটরদের এলডিপি পয়েন্টগুলো বর্তমানে যেভাবে আছে তাতে করে লাস্টমাইল ওভারহেড ক্যাবল (ঝুলন্ত তার) অপরিহার্য। ঝুলন্ত তার এড়াতে হলে এলডিপির সংখ্যা বাড়াতে হবে যা এনটিটিএন অপারেটরদের দায়িত্ব।

প্রসঙ্গত, দেখা গেছে, প্রতিবার এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে ডিপিডিসি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এসবের দায়দায়িত্ব এনটিটিএন অপারেটরদের বদলে আইএসপি অপারেটরদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

আমরা শহরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্ছিদ্রকরণের লক্ষ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে চাই। এই লক্ষ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের উপসচিবকে প্রধান করে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যবৃন্দ হলো, ডেসকো, ডিপিডিসি, বিটিআরসি, সামিট কমিউনিকেশন, ফাইবার অ্যাট হোম, বিটিসিএল, কোয়াব এবং আইএসপিএবি।

এই কমিটি টেকনিক্যাল সমস্যা সমূহ মনিটরিং এবং যাচাই বাছাই করে গত ২ বছর যাবৎ ঝুলন্ত তার অপসারণের কাজ করে আসছে। আপনারা জানেন যে, ইতিমধ্যে প্রধান প্রধান সড়ক হতে তার নামিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করানো হয়েছে।

আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকা বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা যেখান থেকে বাংলাদেশের সকল বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, ব্যক্তি মালিকানাধীন অধিকাংশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, গার্মেন্টস অফিস, বিমা কোম্পানি এবং বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এছাড়া বহির্বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম এই এলাকা থেকেই পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

কিন্তু বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার মতো স্পর্শকাতর বাণিজ্যিক এলাকায় কিভাবে তার অপসারণের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এ পর্যন্ত প্রায় সকল প্রধান সড়ক থেকেই টেকনিক্যাল সমাধান এবং আলোচনার মাধ্যমে তার অপসারণ করে আসছি, যা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মতিঝিল এলাকায় ২টি এনটিটিএন-ই আমাদের টেকনিক্যাল সমাধান আজও পর্যন্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার কারণে পূর্বে একবার অত্র এলাকার তার কাটার পরও কিছু কিছু তার আবার আমরা তুলতে বাধ্য হয়েছি। কারণ, ইউজারদের কাছে লাস্ট মাইল কানেকশনে কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড সমাধান না থাকায় আমরা ওভারহেড ক্যাবল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এক মিনিটও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তার জন্য আমাদের সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়, যার বিরূপ প্রভাব পড়ে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। ওভারহেড ক্যাবলের কারণ ও সৃষ্ট ফলাফল নিয়ে এনটিটিএন এবং আইএসপিএবি’র সীমাবদ্ধতা এবং সমস্যাসমূহ নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি আপনাদের জন্য প্রদর্শিত হলো।

মতিঝিল এলাকায় সামিটের ৮টি এবং ফাইবার অ্যাট হোমের ৮টি এলডিপি আছে, যেখান থেকে প্রত্যেকটি বিল্ডিংয়ে কানেকশন দেয়া হয়। যে সব ভবনে এলডিপি নেই, সে সব ক্ষেত্রে ওভারহেড ক্যাবল লাগবেই। তাই এলডিপির সংখ্যা না বাড়ানো পর্যন্ত ওভারহেড ক্যাবল থাকবেই। ওভারহেড ক্যাবল থাকার সব দায় দায়িত্ব এনটিটিএন অপারেটরদেরই। তাই তাদেরকে তদারক করার জন্য বিটিআরসি ও পাওয়ার মিনিস্ট্রিকে অনুরোধ করা হলো।

আপনারা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ সরকার গত ছয় বছর যাবৎ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। সরকারের পাশাপাশি আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর জন্য আমরা সারা দেশের গণমানুষের দোরগোড়ায় এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এনটিটিএনের মাধ্যমে সংযোগ দিয়ে আসছি। এনটিটিএনদ্বয় যে সব এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড সেবা দিতে সক্ষম সে সব এলাকায় আমরাও আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছি।

কিন্তু অন্যান্য যে সব এলাকায় তারা আন্ডারগ্রাউন্ড অবকাঠামো তৈরি করতে পারেনি সেখানে আমাদের ওভারহেড ক্যাবল ব্যবহার ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিছু এলাকায় শুধু একটা এনটিটিএন নেটওয়ার্ক করেছে। আরেকটি এনটিটিএন না থাকায় শুধু একজনের ওপর নির্ভর করে আমরা সেখানে গেলেও ভালো সার্ভিস পাচ্ছি না। সামিট কমিউনিকেশন শুধু কোর লিজ দেয়, ক্যাপাসিটি দেয় না, তাও আবার মিনিমাম ৬ কিলোমিটারের টাকা না দিলে তারা কোর দেয় না। ১ কিলোমিটার কানেকশন দেওয়ার জন্য ১২,০০০/- দিতে হয়। তার মানে আমরা তাদের কাছ থেকে কানেকটিভিটিও নিতে পারি না।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ২১ আগস্ট তারিখে এই এলাকা থেকে ঝুলন্ত তার অপসারণ করা সম্ভব নয়। তারপরও ডিপিডিসি ও ডেসকো যদি ওই তারিখে ক্যাবল অপসারণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে তার ফলে ইন্টারনেট সেবায় যদি বড় ধরণের কোনো বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়- তার সম্পূর্ণ দায়ভার ডিপিডিসি ও ডেসকোর ওপরই বর্তাবে এবং এক্ষেত্রে আইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।

এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি কর্পোরেট হাউস, ব্যাংক ও অন্যান্য শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে জানানো যাচ্ছে যে- তার কাটার হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-ডাটা, ব্যাংকিং ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগাযোগ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে (অচল হয়ে যেতে পারে)। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য আপনাদের সবার সার্বিক সহযোগিতা আশা করছি আমরা।

প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, ডেসকো ও ডিপিডিসির ক্যাবল অপসারণের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে যেসব ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব পড়বে তা নিম্নরূপ:
১. ব্যাংক ২. শেয়ার বাজার ৩. পোশাক শিল্প ৪. শিক্ষা প্র্রতিষ্ঠান ৫. সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৬. সফটওয়্যার শিল্প ৭. ই-মেইল, স্যোশাল নেটওয়ার্কিং এবং ই-টিকেটিং।

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের প্রস্তাবনা
১. লাস্টমাইল আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশন এনটিটিএন অপারেটরকে নিশ্চিত করতে হবে
২. এনটিটিএনের মূল্য প্রতি মিটার ২ টাকা হারে নির্ধারিত হয়ে আছে। ইন্টারনেটের মূল্য কয়েক ধাপে কমলেও এনটিটিএনের মূল্য অপরিবর্তিতই আছে। এনটিটিএনের এই উচ্চমূল্য কমাতে হবে।
৩. লাস্টমাইল আন্ডারগ্রাউন্ড সংযোগ স্থাপন ছাড়া যদি কোনো তার কাটা হয় তবে এসংক্রান্ত দায়দায়িত্ব ডিপিডিসি-ডেসকোকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আরও উল্লেখ করা যায়, যে সব এলাকার তার কাটা হবে সেসব এলাকায় ইন্টারনেট এবং ডাটা কানেকটিভিটি (সংযোগ) বন্ধ থাকবে এবং এর দায়দায়িত্বও ডিপিডিসি ও ডেসকোকে নিতে হবে
৪. এনটিটিএন লাইসেন্স প্রাপ্তির সুযোগ ডিপিডিসি, ডেসকো ও সিটি কর্পোরেশনসহ আরো ২-৩টি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হোক।তা না হলে এনটিটিএনের সুবিধা আইসপিসমূহের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া সম্ভব হবে না।
৫. এনটিটিএন অপারেটদের লাইসেন্সে লাস্ট মাইল সংযোগ দেয়ার অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও তারা সংযোগ প্রদান করছে। উক্ত বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

মো. ইমদাদুল হক
সাধারণ সম্পাদক
আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন