গুগলে বাংলাদেশের গর্ব ভিকি রাসেল

0

নিউজ ডেস্ক, টেকজুম ডটটিভি// প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রচারণার ভাষা এখন ডিজিটাল মিডিয়া। এক্ষেত্রে অর্থ আয়ের দিক থেকে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গুগল। বিশ্বসেরা এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রে এজেন্সি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভিকি রাসেল। প্রযুক্তি মুখে বিজ্ঞাপনের ভাষা তুলে আনার অন্যতম কারিগর তিনি। বিজ্ঞাপন আর প্রযুক্তির ভাষা নিয়ে তার যত গবেষণা।

গুগলের বিজ্ঞাপন বাণিজ্যে নতুন সাফল্যগাথা তৈরির পাশাপাশি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন নিয়ে কাজ করে এমন মাধ্যমগুলোর ব্যবসা উন্নয়নে মনোযোগ তার। যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অফিসে প্রায় ৪০ জন কর্মী তার অধীনে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বুঝে বিজ্ঞাপন দাতা, গুগল এবং এজেন্সির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া তৈরিতেও সফল রূপকার বাংলাদেশি ভিকি রাসেল।

গুগলে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকারী এই তরুণ নিজেই তৈরি করেছেন তার সাফল্যের গল্প। এই গল্প শোনার জন্যই রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন দৈনিক সমকালের প্রযুক্তি সম্পাদক হাসান জাকির।

গুগল এবং এক টুকরো বাংলাদেশ
গুগলে তিনি ইতিমধ্যে তার ক্যারিয়ার সাড়ে সাত বছর অতিক্রম করেছেন। যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে লিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যানালিস্ট (বিক্রয় এবং অপারেশন্স) যা বাংলা করলে দাঁড়ায় প্রধান শিল্প খাত বিশ্লেষক হিসেবে গুগলে যোগ দেন তিনি। গুগল ওয়েবসাইটে সরাসরি চাকরির জন্য আবেদন করেন। ১০ থেকে ১২টি সাক্ষাৎকার শেষে নিয়োগপত্র হাতে পান তিনি। গুগলে চাকরি নিজের ক্যারিয়ারে অন্যতম সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাজ্যে গুগল কর্মী হিসেবে স্থানীয় ডিজিটাল মার্কেটের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসিফায়েড নিয়েও কাজ করেন। মার্কেট বিশ্লেষণে গুগল ব্লগে নিয়মিত আর্টিকেল লেখার কাজটিও চালিয়ে গেছেন তিনি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ম্যানেজার তথা কৌশলগত অংশীদার ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। কাজের এলাকা উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের দায়িত্ব বুঝে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলের প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত হন তিনি।

গুগলের বিজ্ঞাপনী সেবা বিশেষ করে গুগল অ্যাডওয়ার্ডেস সেবা বৃদ্ধিতে কাজ করেন। এক বছর পাঁচ মাস এই দায়িত্ব পালন শেষে ২০১২ সালে তার ক্যারিয়ারে যুক্ত হয় নতুন সাফল্যগাথা। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল বাণিজ্য বিস্তারের দায়িত্বটি পাকাপাকিভাবে ভিকি রাসেলের হাতে তুলে দেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সার্জিও ব্রিন। ডিজিটাল মিডিয়া কমিউনিটিকে গুগলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তার যত ভাবনাচিন্তা। এর আগে তিনি মিলওয়ার্ড ব্রাউন, এইচপির অঙ্গ সংস্থা ইডিএসে ব্যবসায় বিশ্লেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে গুগলের মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তি কোম্পানিতে এত বড় দায়িত্ব তিনি কেন পেয়েছেন- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে অন্তত ৩৩টি বিষয়ে দক্ষতা রয়েছে তার। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে ভূগোল ও উন্নয়ন শিক্ষায় স্নাতক করেছেন। তবে এর আগে ঢাকার স্কলাস্টিকা থেকে ও এবং এ লেভেল সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও ছিল তার সমান আগ্রহ। ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবলে সমান দক্ষতায় খেলে গেছেন তিনি। তবে এক সময় ঝুঁকে পড়েন ক্রিকেটে। খেলেছেন ঢাকার দ্বিতীয় এবং প্রথম বিভাগে। ঢাকার ক্রিকেটে তার ব্যাটিং গড় জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মতোই বলা যায়! ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদেহি ভিকি রাসেল ফাস্ট বলটাও বেশ করতেন। স্কলাস্টিকায় পড়ার সময় তাদের কোচিংয়ের দায়িত্ব ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেট কোচ সারোয়ার ইমরান। তবে একটা ইনজুরিতে পড়ে ক্রিকেটটা আর চালিয়ে যেতে পারেননি। পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন ইংল্যান্ডে। কী জানি এই ইনজুরি না হলে হয়তো জাতীয় দলেই দেখা যেত তাকে! এমনটা শুনে মুখবয়বে এক পসলা হাসি ছড়িয়ে দেন বন্ধুমহলে পরিচিত ভিকি। তবে সেটি হলে তো দুঁদে ডিজিটাল মার্কেট বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা হতো না তার।

চাকরি সূত্রে অধিকাংশ সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে হয় তাকে। তবে সুযোগ পেলেই ছুটে আসেন দেশে। দেশের প্রতি কী এক অনিবার্য টান বোধ করেন তিনি। ফলে স্বভাবতই তার ফেসবুক টাইমলাইনে শোভা পায় লাল-সবুজ পতাকার ডুডল। দেশের তরুণদের গুগল তথা তথ্যপ্রযুক্তিতে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহের কমতি নেই তার। নিজের প্রচেষ্টায় গুগলকে বাংলাদেশে গুগলকে নানা কাজে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে গুগল থেকেও সহযোগিতা পান বলে জানালেন।

বাংলাদেশে কোনো বিষয়ে ক্যাম্পেইন কিংবা অন্য যে কোনো উদ্যোগ নিতে হলে গুগল তার পরামর্শ এবং সহযোগিতা নিয়ে থাকে। বাড়তি এ দায়িত্বটুকু হৃষ্টচিত্তেই পালন করে থাকেন তিনি। অনেকটা ছুটি হলেই ছুটে আসেন দেশে। দেশের জন্য টানটা তার এমনই। দেশে বেশ কয়েকটি গুগল ডেভেলপার গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব গ্রুপ গুগলের বিভিন্ন সেবা নিয়ে কাজ করে থাকেন। এর মধ্যে গুগল জিডিজি, জিবিজির একাধিক গ্রুপ ছাড়াও রয়েছে নারীদের নিয়ে রয়েছে উইমেন টেকমেকারসের মতো গ্রুপ।

তিনি জানালেন, চাইলে আগ্রহীরা ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের গ্রুপ করে গুগলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তার নিজস্ব আগ্রহেই বলা যায় একের পর এক বাংলাদেশে নিজেদের বিভিন্ন সেবা নিয়ে কাজ করছে গুগল। গুগল বাংলাদেশের কাজের পরিধি সম্পর্কে তিনি বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে কিন্তু বাংলাদেশে গুগল কিন্তু বেশ ভালো কাজ করছে। খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলা অনুসন্ধান ফিচারটি অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই বাংলা তথ্য অনুসন্ধানে বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানের পার্থক্য ধরতে পারবেন। গুগল ম্যাপিং সেবা ঢাকায় দারুণ কাজ করছে। এখন গুগল ম্যাপিং সেবার সহায়তায় যে কেউ ঢাকার যে কোনো প্রান্তে যেতে পারবেন। দেশের অন্যান্য শহরেও ম্যাপিং সেবার আওতায় আনার কাজ চলছে। আমরা দেশে গুগল বাস এনেছি। শিক্ষার্থীদের গুগল বাসের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। তরুণ প্রজন্মকে গুগলের বিভিন্ন সেবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং সম্পৃক্ত করতে বিজনেস এবং ডেভেলপিং গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েডের ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ডেভেলপার তৈরিতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ অফিস চালু না হওয়ায় একধরনের আক্ষেপ রয়েছে তার।

বাংলাদেশে বর্তমানে গুগলের দু’জন কনসালট্যান্ট দায়িত্ব পালন করছেন। গুগলের আপাতত বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনার ইচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীতে নিশ্চয়ই গুগল তার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনবে। যোগ্য কর্মী বেছে নিতে এখন বাংলাদেশ নিয়মিত আসছে গুগল। চলতি বছরও কয়েক ধাপের পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত পাঁচজন মতো কর্মী নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংখ্যাটি আগামীতে আরও বাড়বে বলাই যায়। তিনি বলেন, দেশে মেধার কোনো অভাব নেই। তবে মেধাবী প্রজন্মকে সঠিক সময়ে কাজে লাগাতে প্রয়োজন মেধার সঠিক পরিচর্যা।

তবে তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশে নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছি আমরা। পিছিয়ে থাকার গল্পটিকে পেছনে ফেলতে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব ওপর দেন তিনি। এর মধ্যে দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং নিজেকে প্রকাশ করার ওপর জোর দেন। দক্ষতা বৃদ্ধিতে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকা এবং ওই বিষয়ে কাজ করার সামর্থ্য অর্জন করা। যেমন ধরুন অ্যান্ড্রয়েডের নতুন একটি সংস্করণ চালু করা হলো। এ সংস্করণের পাশাপাশি সংস্করণটি সম্পৃক্ত নানা সেবা নিয়েও কাজের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আর দক্ষতা অর্জন সম্ভব হলেই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। আর আমি যে ভালো প্রোগ্রামার কিংবা ডেভেলপার কিংবা মার্কেটিয়ার সেটি অন্যদের জানানোর জন্য বিভিন্ন কর্মশালা, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে। এসব প্রতিযোগিতায় ভালো করলে বিশ্বসেরা কোম্পানি আপনাকে নিয়োগ দিতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাবে। এ জন্য আমাদের যেটি করা উচিত, খুদে শিক্ষার্থী পর্যায়েই এ ধরনের প্রতিযোগিতা। সেটি হতে পারে আইডিয়া শেয়ারিং, উদ্ভাবনমূলক কিংবা প্রোগ্রামিং। এ ধরনের কাজ দেশজুড়ে পালন করা গেলে এ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের সাফল্য আসতে পারে।

বাংলাদেশিদের জন্য গুগল নিয়ে আরেকটি আক্ষেপের নাম বাংলা ভাষায় অ্যাডসেন্স সমর্থন না করা। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, গুগল অ্যাডসেন্স নিয়ে অনেক কারিগরি এবং কৌশলগত বিষয় রয়েছে। কবে নাগাদ গুগল অ্যাডসেন্স বাংলা ভাষা সমর্থন করবে সেটি উল্লেখ না করলেও আশ্বস্ত করলেন, এটি নিয়ে আমরা অনেক কাজ করছি। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরাও এ প্রচেষ্টায় যুক্ত আছেন। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত বিষয়টির একটি ইতিবাচক সমাধান দিতে। গুগলে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪০ জনেরও বেশি কর্মী রয়েছেন। বাংলাদেশি এ কর্মীদের মধ্যে চমৎকার আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্কের টানেই গুগল প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে বাংলা কমিউনিটি। যার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন ভিকি রাসেল।

পারিবারিক জীবন
গুগল কর্মকর্তার বাইরে আরেকটি পরিচয় রয়েছে তার। ভিকির মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। মায়ের ভীষণ ভক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছেন মা। দিয়েছেন অপার স্বাধীনতা। নিজের পছন্দ মতো বেছে নেওয়ার সুযোগ। নিজেকে এক্সপোজ করার সুযোগটি এসেছে তার হাত ধরে। ফলে মায়ের আন্তর্জাতিক সাফল্যই তাকে অনেকটা প্রাণিত করেছে এটা বলাই যায়। কাজ এবং ঘরপ্রিয় মানুষ ভিকি রাসেল। প্রয়োজনের সময় কাজে যেমন ডুব দিতে পারেন, তেমনি পরিবারের দায়িত্বেও আপোসহীন তিনি। ‘মায়া আপা’র উদ্যোক্তা স্ত্রী আইভি হক জানান, ভিকি পরিবারের প্রতি ভীষণ দায়িত্বশীল। দুই কন্যার কাছে বাবা হিসেবে প্রিয়।

ভবিষ্যতের প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশ
২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৮০ ভাগ মানুষের হাতে স্মার্টফোন থাকবে। সুতরাং আগামীর পরিবর্তন কিংবা বাণিজ্য যেটিই বলি না কেন তা স্মার্টফোন নির্ভর হবে বলে মনে করেন ভিকি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে বলেন, এটা আমাদের জন্য দারুণ সুযোগ তৈরি করবে। একজন মানুষের হাতে স্মার্টফোন পেঁৗছে যাওয়া মানে তার হাতে ইন্টারনেট বিশ্ব পেঁৗছে যাওয়া। অল্প খরচে একজন মানুষের বিশ্বকে তুলে দেওয়ার এ সুযোগ মিস করা যাবে না। বিষয়টিতে গুগলও জোর দিচ্ছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে যে বিশাল পরিবর্তনটি হতে যাচ্ছে সেটি আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন