শাহিদ বাপ্পি
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি)। এরপর ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ বোর্ডকে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডে (বিটিসিএল) রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়, যা বাস্তবায়িত হয় ২০০৮ সালের ১ জুলাই। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বছর লাভের মুখ দেখলেও এর পর থেকে এ পর্যন্ত ধারাবাহিক লোকসানের মুখে রয়েছে সংস্থাটি; ফি বছরই বাড়ছে লোকসান। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে বিটিসিএল। বহনসুবিধার কারণে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, ল্যান্ডফোন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গ্রাহক, এটি বিটিসিএলের আর্থিক খাদে পড়ার বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এখন বিটিসিএলকে ভারতের ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশনের (ডিওটি) আদলে গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ-সংক্রান্ত নথিপত্র বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপোয়। অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন শেষে এটি চূড়ান্ত হবে।

অধিদপ্তর না হওয়ায় বিটিসিএলে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন সংস্থাটির প্রকৌশলীরা, ঝুঁকছেন অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। উপরন্তু, কোম্পানি হওয়ায় টেলিকম ক্যাডার সার্ভিসের কাউকে নিয়োগও দেওয়া যাচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধানকল্পেই নতুন এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিটিসিএল সূত্রে জানা যায়, মোবাইল ফোনের জোয়ারে দেশে এখন ল্যান্ডফোনের দুর্দিন চলছে; গ্রাহকই পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থনৈতিকভাবে বিটিসিএলের কোণঠাসা হয়ে পড়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। দফায়-দফায় সংযোগ ফি, লাইন রেন্ট, কলরেট কমিয়েও নতুন গ্রাহক সংগ্রহে আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। বরং মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে দেশে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার কমতে-কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে সচরাচর সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোয় নতুন সংযোগ নেওয়া হয়।

সূত্রমতে, বিদ্যমান গ্রাহকদের কাছ থেকেও বিটিসিএল আগের মতো বিল পাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে বিটিসিএল প্রায় ১৩ লাখ লাইন দিতে সক্ষম। সংযোগ আছে মাত্র ৯ লাখ।
২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৪৪ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। গত অর্থবছরেও বিটিসিএলে আয় ছিল ১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা ও ব্যয় ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। আয় কমার েেত্র কারণ হিসেবে কোম্পানির কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক টেলিফোন কল থেকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক কল টারমিনেশনের েেত্র এখন অনেক অপারেটর তৈরি করেছে সরকার। অথচ একসময় একচ্ছত্রভাবে এটি ছিল বিটিসিএলের হাতে। গত অর্থবছরে সরকারের অন্য চারটি টেলিযোগাযোগ কোম্পানি অবশ্য লাভের মুখ দেখেছে।

টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন বলেন, বিটিসিএলকে আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকসেবা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ডট হচ্ছে অন্যতম, যা সরকারি সিদ্ধান্তের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি কার্যকর হলে টেলিযোগাযোগ খাতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
বিটিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কোম্পানি করা হলে টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যান্য কোম্পানির মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়।

কিন্তু বিটিসিএল হওয়ার পর গত ছয় বছরেও সরকার একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। এখন এটি না কোম্পানি, না সরকারি প্রতিষ্ঠান- এমন অবস্থায় আছে। শুধু নাম পরিবর্তন ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অন্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। সবকিছু চলছে আগের মতোই। কোম্পানি আইনে যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে, বিটিসিএলে সেগুলো রয়েছে শুধু কাগজে, বাস্তবে নয়। সেবার মান বাড়ানোর যে ল্য নিয়ে সরকার বিটিসিএলকে কোম্পানি করেছিল, সে ল্য পূরণ হয়নি। খাদ থেকে টেনে তোলা যায়নি সংস্থাটিকে। ডিওটিতে রূপান্তর করা হলে কী হয়- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন