গ্রামীণফোনের বীমায় ব্যাপক অনিয়ম

0

মুজিব মাসুদ ও সাঈদ আহমেদ// ‘অল রিস্ক’ বীমা পলিসিতে ব্যাপক হারে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে। একটি বেসরকারি বীমা সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে গ্রামীণফোন দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। এ প্রক্রিয়ায় গত তিন বছরে সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ প্রিমিয়াম কম পরিশোধ করে গ্রামীণফোন। আর ভ্যাট ফাঁকি দেয় ৬৬ লাখ টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রামীণফোন ২০১১ সালে একটি ‘অল রিস্ক’ বীমা পলিসি (নং- আরআইএল/এইচ-ও/আইএআর/ পি-০০০২৩/০৯/২০১৪) করে। ৭ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার এ বীমাটি দেশের সবচেয়ে বড় বীমা হিসেবে পরিচিত। বীমাটি করা হয়েছে দেশের ৫টি বেসরকারি বীমা কোম্পানির সঙ্গে। তবে গ্রামীণফোন প্রিমিয়াম রেট নির্ধারণসহ যাবতীয় অনিয়ম-দুর্নীতিগুলো করছে নেতৃত্বে থাকা বীমা কোম্পানির সঙ্গে। এ নিয়ে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) তদন্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যে আইডিআরএ থেকে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেআইনিভাবে কম হারে প্রিমিয়াম নেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে গ্রামীণফোনের সঙ্গে লেনদেন করা শীর্ষ বেসরকারি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। বেআইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে সংস্থাটি গ্রামীণফোনসহ বিভিন্ন গ্রাহককে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে ওই অভিযোগে বলা আছে। বীমা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাধারণত কোনো বীমা কোম্পানি ইচ্ছা করেই এ ধরনের অনিয়ম করে না। গ্রাহকের ইচ্ছার ওপরই এ ধরনের কাজ করে থাকে কোম্পানিগুলো। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মূলত গ্রামীণফোনই অনিয়ম-দুর্নীতি আর ভ্যাট ফাঁকি দিতে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করেছে।

সূত্র মতে, বীমা আইনে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া প্রিমিয়াম কম নেয়ার বিধান নেই। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট পলিসি বাতিল করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনা জানাজানি হলেও আইডিআরএ’র একটি গ্র“প গ্রামীণফোনের পক্ষে কাজ করছে। তারা কৌশলে বেআইনিভাবে গ্রামীণফোনের পলিসিটি বহাল রেখেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা জানান, মূলত সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতেই বীমা কোম্পানি ও গ্রামীণফোন পলিসি করতে এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির পথ বেছে নিয়েছে। তিনি অবিলম্বে আইডিআরএকে ঘটনাটি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান।

ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি সূত্রে জানা গেছে, এই অবৈধ প্রক্রিয়ায় ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গ্রামীণফোন সাড়ে ৪ কোটি টাকার প্রিমিয়াম কম পরিশোধ করেছে। চলতি বছরও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আবারও পলিসি নবায়ন করেছে গ্রামীণফোন।

সূত্র মতে, বীমা পলিসির পরিশোধিত প্রিমিয়ামের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পায় সরকার। ভ্যাটের এ অর্থ গ্রাহকের পরিশোধ করার বিধান। কিন্তু গ্রামীণফোন সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে।
জানা যায়, গ্রামীণফোনের পলিসি নবায়ন করা হয়েছে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। এটির মেয়াদ ৩১ আগস্ট ২০১৪ থেকে ৩১ আগস্ট ২০১৫ পর্যন্ত। ইতিমধ্যে এই পলিসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি গ্রামীণফোনের বীমা পলিসির প্রিমিয়াম হার ‘ম্যাটেরিয়াল ড্যামেজ কাভারেজে’ ০.১২৭৯ শতাংশ এবং বিজনেস ইন্টারাপশন কাভারেজে ০.১২ শতাংশ হার নির্ধারণ করে দেয় সেন্ট্রাল রেটিং কমিটি (সিআরসি)। নতুন হারের জন্য সিআরসির কাছে পরবর্তীকালে আর কোনো আবেদন করেনি গ্রামীণের প্রধান বীমা কোম্পানিটি। অথচ ২০১৪ সালে গ্রামীণফোন ৭ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার বীমা পলিসি নবায়নে প্রিমিয়াম পরিশোধ করে ০.১০৮০ শতাংশ হারে। অভিযোগ আছে, এ হিসেবে ওই বছর ০.০১৯৯ শতাংশ প্রিমিয়াম কম পরিশোধ করে। এই অংক ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১২ ও ২০১৩ সালেও প্রায় একই পরিমাণ অর্থ প্রিমিয়াম কম পরিশোধের মাধ্যমে পলিসি চালিয়ে যায় গ্রামীণফোন।
সূত্র জানায়, বীমা আইন ২০১০-এর ১৭ ধারা অনুসারে সাধারণ বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে সিআরসি। কোনো পলিসি ইস্যু করতে রেটিং কমিটি থেকে প্রিমিয়াম হার অনুমোদন করিয়ে নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রামীণফোনের পলিসির ক্ষেত্রে তাদের নিযুক্ত প্রধান বীমা কোম্পানি সেই অনুমোদন না নিয়েই বিশেষ সুবিধা দেয় গ্রামীণকে।

আইন অনুসারে গ্রামীণফোনের ৭ হাজার কোটি টাকার ‘অল-রিস্ক’ পলিসিটি বিদেশী অপর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুনঃবীমা করতে হয়। জানা গেছে, পুনঃবীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও বেসরকারি বীমা কোম্পানির চুক্তির বিষয়টি অবৈধভাবে তদারকি করছে গ্রামীণ ফোন।

আইনত বিদেশী পুনঃবীমা প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়ামের টাকা বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিশোধ করার কথা। কিন্তু অবৈধভাবে সেটি গ্রামীণফোন পরিশোধ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে শনিবার ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান শেফাক আহম্মেদকে টেলিফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এদিকে এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। গত সপ্তাহে গ্রামীণফোনের জনসংযোগ শাখার দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে মেইল করলেও শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা মেইলের কোনো জবাব দেননি। শনিবার টেলিফোনে যোগাযোগ করলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

সুত্র: দৈনিক যুগান্তর, ১১ অক্টোবর ২০১৫ প্রকাশিত

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন