সাইবার আইন নিয়ে আন্তর্জাতিক কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরাথাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর হয়ে গেল সাইবার আইন ও ইন্টারনেটে বাক্স্বাধীনতা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কর্মশালা। ইংল্যান্ডের মিডিয়া লিগ্যাল ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ এবং থাইল্যান্ডের আই ল নামের দুটি বেসকারি প্রতিষ্ঠান এ কর্মশালার যৌথ আয়োজক। এতে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও ইউরোপ থেকে ১৫টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এই প্রতিনিধিদের বেশির ভাগই ছিলেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী। বাংলাদেশ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, মানবাধিকারকর্মী আহমেদ স্বপন মাহমুদ ও এই প্রতিবেদক কর্মশালায় অংশ নেন।
দুই দিনের এই কর্মশালা মূলত সাতটি অধিবেশনে ভাগ করা হয়। অনলাইনে বাক্স্বাধীনতা, বিচারব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক স্বাক্ষ্যব্যবস্থা, বিভিন্ন দেশে সাইবার আইন ও এর প্রয়োগ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয় প্রাধান্য পায় কর্মশালায়। বিভিন্ন দেশের একজন করে বক্তা তাঁদের নিজেদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন এবং এক দেশের অবস্থান থেকে অন্য দেশ কীভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে, সেদিকে আলোকপাত করেন। কর্মশালায় সবচেয়ে গুরুত্ব পায় সাইবার আইন এবং বিচারব্যবস্থায় সাইবার আইন প্রয়োগের বিভিন্ন দিক। বিভিন্ন আলোচনা ও গবেষণা শেষে এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন রূপরেখা তুলে ধরেন আলোচকেরা। এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাইবার আইনের ধরন ও প্রয়োগ কম-বেশি প্রায় একই রকম। এসব দেশে সাইবার আইন প্রয়োগে এবং আদালতে বিচারব্যবস্থার বড় বাধা হলো প্রযুক্তিবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিচারক ও আইনজীবীদের ইন্টারনেট ও কম্পিউটারবিষয়ক অজ্ঞতা সাইবার আইন কার্যকর এবং সাইবার অপরাধের বিচারে বড় বাধা।
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশের অবস্থা এ ক্ষেত্রে নাজুক। ডিজিটাল সাক্ষ্য প্রবর্তনে এশিয়ার দেশগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। অনেক দেশে সাক্ষ্য আইনে কোনো রকম সংশোধন করে ডিজিটাল সাক্ষ্য কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা রাখা হয়নি। এ কারণে সাইবার অপরাধের বিচারে অনেক ত্রুটি দেখা যায়।

কর্মশালায় বিভিন্ন দেশের অনলাইনে বাক্স্বাধীনতা এবং এ বিষয়ে সরকারের নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন দেশে ইউটিউব, ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সাইট বন্ধ করে দেওয়া-সংক্রান্ত মামলা ও উচ্চ আদালতের রায় তুলে ধরা হয়। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানে ইউটিউব বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে মামলা সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ মামলার আইনজীবী ইয়াসির হামাদানি ইউটিউব মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

শ্রীলঙ্কার আইনজীবী সেইলিয়া পারিস এবং ভারতের আইনজীবী অপর গুপ্তও এ বিষয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিমালা থাকা উচিত এবং বিভিন্ন দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষটিও গুরুত্ব পায় কর্মশালায়। এ ক্ষেত্রে ভারতের বক্তারা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের একটি খসড়ার কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাইবার আইন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ৫৭ ধারা নিয়ে আলোচনা হয় এবং এ আইনকে কালো আইন বলেও অনেকে মন্তব্য করেন।
তবে সব ছাপিয়ে প্রতিটি রাষ্ট্র প্রযুক্তিবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নজর দেবে—এ আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সেই সঙ্গে অনলাইনে বাক প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন না করার জন্য প্রতিটি দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন