মো. শফিউল আলম// ই-কমার্সের পুর্নরুপ ইলেক্ট্রনিক কমার্স বা ইলেক্ট্রনিক বানিজ্য যা ইন্টারনেটকে একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে পন্য বা সেবার বাণিজ্যিকরণ। যেখানে একজন ক্রেতা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেবাদাতার ওয়েবসাইটে অর্ডার করে ওখানেই মুল্য পরিশোধ সাপেক্ষে অথবা পন্য বুঝে পেয়ে নগদ মুল্য পরিশোধ করা। এটি বাংলাদেশের জন্য নুতন অভিজ্ঞতা এবং গ্রাহকদের জন্য সংযোজন সেবা যা ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন লেনদেনের অনুমতি সাপেক্ষে উন্মুক্ত হয় একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ই-কমার্স বা ডিল সাইটগুলি হল: আমাজন, আলিবাবা, ই-বে। আর বাংলাদেশি সাইট হিসেবে এখনি, আজকেরডিল, কায়মু, দারাজ, ব্রানো, এসো বেশ পরিচিত। আর সার্ভিস ভিত্তিক ওয়েবসাইট ইজি.কম.বিডি, বিল্যান্সার.কম ইত্যাদি ।

আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশে প্রায় ২০০০ টির বেশী ই-কমার্স এবং এফ (ফেসবুক)-কমার্স সাইট আছে যার অধিকাংশ কোম্পানী অনিবন্ধিত যেহেতু আপেক্ষিকভাবে প্রচলিত এবং ফেসবুক তরুনদের অনেকেই সরল ভাবেই সমীকরনটি কষে থাকেন। যেমন- ব্যবসাটি শুরু করা অনেক সহজ ১০০০ টাকার ডোমেইন ৩০/৪০ হাজার টাকায় একটি ওয়েবসাইট আর লাখ খানেক টাকার নন-রিস্ক চলতি মূলধন শুধুমাত্র কয়েকটি সাপ্লায়ার ঠিক করে অনলাইনে প্রচারনা চালানো। গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে, নিজের ডেলিভারি ম্যান দিয়ে বা কোন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পন্যটি পৌছে দেয়া। অন্যের পন্য বিক্রি করে ভালো একটি কমিশন পাওয়া, আপেক্ষিকভাবে এরকম সহজই মনে হয়, কোন দোকান ভাড়ার প্রয়োজন নেই, ফার্নিচার, লজিস্টিক, অফিস বা ইউটিলিটি নেই।

তাই লোকাল কনভেনিয়েন্ট স্টোরের মালিকরা বা নন-টেকি ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা ভাবতেই পারেন ই-কমার্স উদ্দোক্তারা হয়তো তাদের ব্যবসায় বিনা মুলধনে ভাগ বসাচ্ছেন অথবা তারা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে তাই কেউ কেউ দাবী তুলে থাকতে পারেন। অথবা কর্তৃপক্ষের বুঝাতে সক্ষম হয়ে থাকতে পারেন একই সরল সমীকরনে কেন ওরা আমাদের পন্য নিয়ে সহজেই ব্যবসা করবে। তাই হতে পারে প্রিভিলেজড খাত হিসাবে ৪% ভ্যাট আরোপ হয়েছে। হাইপোথ্যাটিকেলি আমার তাই মনে হয়েছে অথবা আমাদের সম্মানিত পলিসিমেকার নিজেরাই এই মেথেমটিকসটি অনুধাবন করে থাকতে পারেন।

আমি যখন ভ্যাট দিব, তা কিভাবে দিব? এটাকে জেনেরিক করার তো কোন উপায় খুজে পাচ্ছি না, ই-কমার্স তো কোন ক্যাটাগরি নয় আলাদা করে এইচএস কোড বসিয়ে সহজেই করারোপ করা যাবে, এখানে গোডস এবং সার্ভিসকে আলাদা করতেই হবে। ই-কমার্স ব্যবসার ধরন যেমন ভিন্ন, তেমন তার পন্য এবং সেবার প্রকৃতিও ভিন্ন । যেমনটি, ইনভেন্টরি বেইজড ই-কমার্স , মার্কেটপ্ল্যাস বেইজ, হাইব্রিড বেইজড এবং সার্সিভ বেইজ ই-কমার্স। ইনভেন্টরী ভেইজড ই-কমার্সঃ এখানে নির্দিষ্ট কোম্পানী নিজেদের পন্য নিজেরা তৈরী করে থাকে এবং অনলাইন স্টোরের মাধ্যমে ক্রেতা আকৃস্ট করে বিক্রি করে এবং এটার জন্য ভূক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী মুল্য সংযোজন কর রিটেইল প্রাইসের সাথে সংযুক্তই থাকে। শুধুমাত্র অনলাইন অর্ডারে কালেক্ট করার জন্য সেখানে ডাবল ভ্যাটের প্রভিশন কিভাবে সেটেল হবে সে বিষয়ে সংশ্লিস্ট অভিজ্ঞরা মতামত দিতে পারবেন।

মার্কেটপ্ল্যাস বেইজড ই-কমার্স
এটি প্ল্যাটফর্ম এজ এ সার্ভিস ( পেএএএস) মডেল বা মার্কেটপ্ল্যাস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত যেখানে বিভিন্ন পন্য বা সেবা দাতারা শুধু তাদের পন্য/ সেবা গুলি লিস্টি করে বিক্রি করে থাকেন, সেখান থেকে প্ল্যাটফর্ম দাতা নির্দিস্ট কমিশন পদ্ধতিতে ব্যাবসাটি পরিচালনা করে থাকেন।

হাইব্রিড বা ফেসিলেটর মডেলঃ অনেক ই-কমার্স কম্পানী অন্যের পন্য লিস্টিংয়ের সাথে এডিশনাল সার্ভিস দিয়ে থাকেন যেমন ওয়ারহাউজ, পেকেজিং, মেইনটেইনিং এবং ডেলিভারী দিয়ে থাকে এবং সার্ভিস বেইজড মডেল হচ্চে – অনলাইন সেবা, টিকিট বিক্রি, সফটওয়ার বিক্রি, মিউজিক ডাউনলোড, আরো অন্যান্য ডিজিটাল গোড্স এবং সার্ভিস দিয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে ই-কমার্স কোন সহজলভ্য বা অতিমুনাফার ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি শুধুমাত্র ইন্টারনেটকে ব্যাবহার করে একটি সেলস ইনোভেশন সিস্টেম এবং জীবনযাত্রাকে সহজ করে। একটি প্রকৃত ই-কমার্স সাইটের তৈরীকরন, ডিজাইন যেমন ব্যয়সাপেক্ষ, তার সাপ্লাই চেইন, কেপিটাল এক্সপন্ডিচার তথাপী সার্ভার, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অফিস ব্যবস্থাপনা, ওয়ার হাউজ, মার্কেটিং, ডেলিভারী , মুল্যমান, রিস্ক এর জন্য বেশীরভাগ ই-কমার্স কোম্পানীগুলি ধংসের ধারপ্রান্তে এবং অধিকাংশ উদ্দোক্তা ইতিমধ্যে প্রচন্ড ক্ষতির সম্মখিন হয়েছেন এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। আর যেহেতু আমাদের ই-কমার্স উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই তরুন, স্টার্ট-আপ এবং অন্যের পন্যের উপর নির্ভরশীল এবং অতি সামান্য মুলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন তাই তাদের মার্কেটিং, সেলস, সাপ্লাই-চেইন সেবা বা প্রচারনা করার মত অবস্থা নেয় তাই বিক্রয় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক কম, তাই কেনায় লাভ করা অনেক কঠিন তার উপর বড় কোম্পানীগুলির সাথে প্রাইস-ওয়ারে আগেই হেরে যায়।

এখানে বলা বাহুল্য যে আমাদের সামগ্রিক বা অধিকাংশ ব্যবসার সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা বা চর্চার ধরন হচ্ছে কোন ফিজিবিলিটি, পলিসি, প্লানিং, রিসার্চ, স্ট্রেটেজি, ফোরকাস্ট, বাজেটিং, আরওআই, মার্কেট নলেজ, গ্যাপ, গতি প্রকৃতি ছাড়াই যে কোন নতুন ব্যবসায় শুধুমাত্র হুজোগে জড়িয়ে পড়া, যে কারনে আমরা সবসময় প্রচলিত বাক্য ঝাপসা বা শটকার্ট খুজে বের হয়ে যেতে চাই যারফলে আমাদের সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশ নস্ট এবং কনসিকুয়েন্স সমস্যা সমুক্ষীন হয়ে থাকি।

আমাদের এই সদ্য ভুমিস্ট ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ২টি সংগ্ঠন কাজ করছেন, বেসিসের ই-কমার্স এলায়েন্স এবং ই-ক্যাব, এখানে একটি প্ল্যাটফর্ম হলেই ভালো হত যার ফলে অনেক আগে থেকেই কমন স্টাডি, পলিসি সাপোর্ট এবং ডিজিটাল স্থাপক সরকারকে সাথে নিয়ে এটাকে অধিকতর গুরুত্বপুর্ন খাত হিসাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল । এই ব্যাব্সার সাথে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন আমি নিশ্চিত তারা সবাই একমত হবেন আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অত্যান্ত আই-টি ফেভারড ব্যাক্তিত্য, আমি বলব আমরা এই ব্যবসার সাথে যারা সংশ্লিষ্ট আছি তারা বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি ব্যবসার ধরন ও প্রকৃতি এটি প্রচলিত ব্যবসার সাথে সাংঘর্ষিক বা ভিন্ন নয় এটা একিই ধরনের পন্য বা সেবা নিয়ে কাজ করে শুধুমাত্র ইন্টারনেট কে একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে সেল্স অর্ডার সংগ্রহ করে এবং বাড়িতে পন্যটি পৌছে দেয়। ইতিমধ্যে ই-কমার্সে অনলাইন স্টোরের মালিকরা এর জন্য বিশেষ সাবসিডি দিয়ে আসছেন অনলাইন ট্রানজেসশন প্রসেসিং ফি ৪-৫% তার উপর হোম ডেলিভারীর জন্য আলাদা সেবা মুল্য, প্রচারনা বাজেট, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা খরচ আরোও অনেক কিছু । যেহেতু সাধারন মানুষ এখানে এই পদ্ধতির সাথে পরিচিত নয় বা পুর্ন বিশ্বাস আসে নি তাই পন্য/সেবার বিক্রয় সংখা অনেক কম, যেহেতু বিক্রয় কম তাই লাভ/কমিশন দিয়ে এসোসিয়েট সেলস কস্টই ঠিকমত উঠে আসে না।

মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ জানাবো, উনার বিশেষজ্ঞ টিমকে দিয়ে যদি ই-কমার্স খাতটির একটি প্রকৃত চালচিত্র বা অডিট করাতেন তাহলে আমাদেরও একটা ধারনা হতো এবং আমাদের করনীয়গুলোও বুঝতে সুবিধা হতো এবং একটা সুন্দর উন্নয়ন পলিসির আওতায় এনে প্রযোজনে কমিশন টেক্স বা ভ্যাটের ফিজিলিবিলিটি বা প্রযোজনীয়তা বুঝা যেত, সরকার অবশ্যই ই-কমার্সকে একটি থ্রাইবিং সেক্টর বা শিল্প হিসাবে বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করানোকেই মত দিবেন। যারফলে মানুষের নিত্য কমডিটি বা সেবা ঘরে বসেই পাবেন ফলে একদিনে যেমন মানুষের সময় বাচাবে, পরিবেশ রক্ষা হবে, ট্রাফিক, জায়গা, গাড়ির তেল কম খরচ হবে, তধুপরি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃস্টি হবে, মানুষের জীবন যাত্রার মান বাড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের আরোও একটি ধাপ এগিয়ে যাবে। পরিশেষে উল্লেখিত সরকারী সহযোগিতা সেবা নিশ্চিতকল্পে ই-কমার্স বা অনলাইন স্টোরের টোটাল সেলস কমিশনের উপর করারোপ করা যেতেই পারে।

মো. শফিউল আলম
প্রধান নির্বাহী কর্মকতা (সিইও)
www.belancer.com

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন