ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর ভ্যাট তুলে নেয়া উচিত: বিসিএস সভাপতি

0

এএইচএম মাহফুজুল আরিফ// ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ: উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’র প্রত্যয় ব্যক্ত করে ৬ শতাংশের চক্র ভেঙে বাজেটে অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। গত বাজেটে তিনি ‘সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ’’ গড়ার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবারে তা আরো একটু পরিমার্জিত করেছেন।

২০০৯ সালে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ৭৬ কোটি টাকার বাজেটকে এখন কেবল আইসিটি ডিভিশনের বরাদ্দকে ১৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত করাকে আমাদের পক্ষে কোননভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নাই।

গতবারের তুলনায়ই এই বৃদ্ধি ৩৫৮ কোটি টাকা। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক ও সাহসী মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাজেটে সফটওয়্যার ও সেবা খাতের কর অবকাশ ২০২৪ সাল অবধি বাড়ানো, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ক্যামেরার শুল্ক ২৫ ভাগ থেকে ১০ ভাগ করা, অপারেটিং সিস্টেম, ডাটাবেজ ইত্যাদি সফটওয়্যার ব্যতীত অন্য সফটওয়্যারের ওপর শতকরা ৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করা এবং হাইটেক পার্কে যারা ব্যবসা করবেন তাদের জন্য বিদ্যুৎ ও ভ্যাট মওকুফ করার মতো ইতিবাচক প্রস্তাব থাকলেও হার্ডওয়্যার খাত ও আইটি অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ হার্ডওয়্যার ও আইটি আবকাঠামো ছাড়া এর কোনোটি থেকেই সুফল পাওয়া সুদূরপরাহত বিষয়।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে আইসিটি ভৌত অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনলোজি পার্ক ও ইনফরমেশন টেকনলোজি পার্কের আগে হার্ডওয়্যার খাতে বিশেষ গুরুত্ব দাবি রাখে। কিন্তু লক্ষ্য করেছি, হার্ডওয়্যার শিল্পকে বাইরে রেখেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেবা খাতে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, চূড়ান্ত বাজেটে আইটি ও আইটিইএস-এর মধ্যে হার্ডওয়্যার খাতকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। এটা না হলে নতুন উদ্যোক্তারা প্রযুক্তি ব্যবসায় আগ্রহ দেখাবে না। তখন আমরা কেবল আইটি ভোক্তার আবর্তেই ঘুরপাক খাবো। প্রযুক্তি খাত শিল্পায়নের শুরুতেই হোঁচট খাবে। এর ফলে মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করাও দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই ডিজিটাল ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে শুধু আইসিটি ডিভিশনই নয়, সরকারের অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা নিশ্চিত করতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হার্ডওয়্যার খাতকে কোনো ভাবেই পেছনে ফেললে চলবে না। হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক খাতের সুসমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া প্রযুক্তি খাত কখনোই উৎপাদনশীল হতে পারবে না। তাই বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে হার্ডওয়্যার শিল্প বিকাশের অন্তরায় দূর করে সমান সুযোগ প্রত্যাশা করছি।

একইসঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন করে অনলাইন কেনাকাটার ওপর ৪ শতাংশ ধার্য করা এবং ব্যবহারকারী পর্যায়ে ইন্টারনেটে ১৫ শতাংশ কর অব্যাহত রাখার বিষয়টিও দেশের তথ্য প্রযুক্তির বিকাশে অন্তরায় হয়ে থাকবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সিম বা রিমের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবায় ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে মোবাইলে কথা বলা ও ডাটা (ইন্টারনেট) ব্যবহারের ব্যয় বাড়বে। এর উপর প্রস্তাবিত ১% সারচার্জ সেবার খরচ আরও বেড়ে যাবে। এমনিতে মোবাইলফোনে কথা বললে বা ইন্টারনেট ব্যবহার করলে গ্রাহককে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা মূসক দিতে হয়। প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে মোবাইল ব্যবহার খরচ বেড়ে যাবে। ফলে মোবাইল নির্ভর প্রযুক্তি সেবার ব্যয় ভোক্তা পর্যায়ে বেড়ে যাবে।

সার্বিকভাবে এই ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। এর মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে তাতেও ভাটা পড়বে। বাড়তি চাপে পড়বেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা মুক্তপেশাজীবীরা। দীর্ঘ দিন ধরে প্রযুক্তি খাতের সকলের সমোচ্চারিত দাবি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থেকে ১৫% ভ্যাট তুলে নেয়া দরকার। যখন সরকারি -বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় প্রযুক্তি খাত থেকে জিডিপিতে ২% অবদান রাখার মাধ্যমে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে তখন আয়ের দিক দিয়ে খুবই সামান্য কিছু অমিমাংসিত বিষয় বারবারই উপেক্ষিত থাকছে!

আমরা আশা করবো, প্রস্তাবিত বাজেটে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় করে অর্থমন্ত্রী ‘ডিজিটাল বাংলদেশ’ বাস্তবায়নে আমাদের প্রচেষ্টাকে আরো গতিময় করার সুযোগ তৈরি করবেন। সাময়িক কিছু নগদ আয়ের কথা বিবেচনায় না এনে দীর্ঘমেয়াদী সফলতার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন।

এএইচএম মাহফুজুল আরিফ
সভাপতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন