৪টি কারণে ই-কমার্স খাতে ৪% ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত: ফাহিম মাশরুর

0

১/ আমাদের দেশে অনলাইন কেনাবেচা বা ই-কমার্স একটি নতুন ব্যবসা। এখনো এই খাত একটি লাভজনক ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে দাড়াতে পারে নি। এই খাতে বেশির ভাগ উদ্যোক্তাই বয়সে তরুণ এবং ‘ফার্স্ট জেনারেসন’ উদ্যোক্তা যারা নিজস্ব তহবিল থেকে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। বেশির ভাগ উদ্যোগই ক্ষুদ্র বা মাঝারি পর্যায়ের। ই-কমার্স ব্যবসার একটি বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে এই ব্যবসার প্রথম দিকে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যান্য দেশের মত এই দেশেও এই ব্যবসায় প্রথম পর্যায়ে অনেক সময় ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় নতুন ‘অনলাইন ক্রেতা’ তৈরী করতে। আমাদের দেশের ই-কমার্স সাইটগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ‘প্রতিযোগিতামূলক’ দামে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করাI যেহেতু দেশে এখনো ই-কমার্সের জন্য পণ্য পরিবহন এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম পুরোপুরি তৈরী হয়নি, সেহেতু প্রতিটি ই-কমার্স সাইটকে বড় অংকের ভুর্তুকি দিতে হয় প্রতিটি Transaction এর জন্য (গড়ে ১,০০০ টাকার পণ্য বিক্রির জন্য পরিবহন ও পেমেন্ট কালেকশন বাবদ অতিরিক্ত খরচ হয় ১৫০ টাকা)। তদুপরি, প্রতিটি ই-কমার্স সাইট নতুন অনলাইন ক্রেতা-ভিত্তি তৈরির জন্য এই পরিমান ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে ৪% ভ্যাট আরোপ হলে সেটিও উদ্যোক্তাদেরকেই বহন করতে হবে, এবং ফলশ্রুতিতে এই নতুন খাত বেড়ে উঠার আগেই হুমকির মধ্যে ফেলবে।

২/ দেশের ই-কমার্স সাইটগুলো যে সকল পণ্য বিক্রি করে তার প্রায় সবই দেশের যেকোনো স্থানের মার্কেটে, অথবা ছোটো বা মাঝারি দোকানগুলোতে বিক্রি হয়। কিন্তু এই সকল দোকানে প্রযোজ্য ভ্যাট-এর প্রকৃত হার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নগন্য (বেশির ভাগ সাধারণ দোকানে ‘প্যাকেজ’ ভ্যাট প্রযোজ্য যা বছরে ১৪ হাজার টাকার বেশি না)। এছাড়াও ঢাকা বা চট্টগ্রামের মত বড় শহরের বাহিরে পর্যাপ্ত ‘ভ্যাট’ আদায় পরিবীক্ষণ পদ্ধতি (Supervision System- যেমন ECR সিস্টেম) না থাকার কারণে বেশির ভাগ দোকানেই সঠিক ভাবে ‘ভ্যাট’ হিসাব বা প্রযোজ্য হয় না। এই প্রেক্ষিতে অনলাইন কেনাবেচায় ৪% ভ্যাট প্রয়োগ হলে ই-কমার্স সাইটগুলো কোনভাবেই প্রতিযোগিতামূলক দামে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। উল্লেখ্য যে, অনলাইন ক্রেতাদের বড় অংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটান অঞ্চলের বাহিরে সারা দেশে অবস্থিত।

৩/ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর অন্যতম অনুসঙ্গ ‘ডিজিটাল কমার্স’ এবং ‘ক্যাশ-লেস (cashless)/ডিজিটাল পেমেন্ট। যত বেশি Transaction অনলাইনে হবে তত বেশি অর্থনৈতিক ও ব্যবসা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা (Transparency) আসবে। বিগত কয়েক বছরে দেশে ব্যাঙ্কিং সেবার প্রসার (বিশেষ করে মোবাইল পেমেন্ট-এর উন্নতি) অর্থনীতি ও ব্যবসা-বানিজ্যকে Informal থেকে Formal পর্যায়ে উত্তরণের বিশাল সম্ভবনা সৃষ্টি করেছে।

ই-কমার্স সাইটগুলো তাদের নিজেদের সকল হিসাব ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে। প্রতিটি কেনাবেচা বা পেমেন্ট Track করা যায়। এই প্রেক্ষিতে যদি ই-কমার্স সাইট গুলো Physical দোকান বা ব্যবসার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে এবং দেশে অনলাইন বানিজ্য প্রসার লাভ না করে, তাহলে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বানিজ্য ‘Informal’ (নগদ লেনদেন ভিত্তিক/ cash-based) থেকে Formal পর্যায়ে উত্তরণের সম্ভবনা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও (উদাহরণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ব্যবসা লেনদেনকে ডিজিটাল (‘ক্যাশ-লেস’ ও ‘স্বচ্ছ’) করার প্রনোদনা দিতে অনলাইন কেনাকাটাকে ‘ভ্যাট’ বা ‘সেলস ট্যাক্স’ এর আওতা বহির্ভূত রাখা হয়েছে।

৪/ বর্তমানে প্রতি বছর যেই পরিমান ই-কমার্স/অনলাইন লেনদেন হচ্ছে তার পরিমান বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি না। এই প্রেক্ষিতে ‘৪% ভ্যাট’ সরকারের রাজস্ব তহবিলে বছরে ৩-৪ কোটি টাকার বেশি যোগ করবে না।

অপর দিকে এই সেক্টরে কয়েক হাজার তরুণ উদ্যোক্তার নতুন আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যেই কয়েকশ ই-কমার্স সাইট এর উদ্যোক্তা যেমন তৈরী হচ্ছে, এর সাথে সাথে এই সাইটগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে পণ্য বিক্রি হবার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কয়েক হাজার নতুন ক্ষদ্র ও মাঝারি ‘পণ্য উদপাদনকারী উদ্যোক্তা’ তৈরী হয়েছে। এছাড়াও এই খাতে আগামী কয়েক বছরে ১-২ লক্ষ নতুন ধরনের চাকরির (সফটওয়্যার, আইটি, কাস্টমার সাপোর্ট, অনলাইন মার্কেটিং, গ্রাফিক্স/ফটোগ্রাফি, লজিস্টিকস, ডেলিভারি ইত্যাদি) সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিপূর্ণ বিকাশ হবার আগেই ‘অনলাইন লেনদেনে ৪% ভ্যাট’ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের এই বিশাল সম্ভাবনাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন