বাড়লো গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, ভোক্তাদের মাথায় হাত

নিউজ ডেস্ক, টেকজুম ডটটিভি// বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার; এর ফলে এখন মাসিক খরচে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে ভোক্তাদের।

গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম গড়ে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান বলেছেন, সেপ্টেম্বর থেকে নতুন হার কার্যকর হবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে সব ক্ষেত্রে। এতে মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়বে ২০ টাকা। ৬০০ ইউনিটের বেশি খরচে অতিরিক্ত গুনতে হবে কমপক্ষে ৩০ টাকা।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে আবাসিক গ্রাহকদের অক্টোবর থেকে অতিরিক্ত ২০০ টাকা খরচ করতে হবে। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের খরচ বাড়বে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় দুই টাকা।

গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৫ টাকা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে।

গ্যাসের দাম সর্বশেষ ২০০৯ সালে বাড়িয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। বিদ্যুতের দাম সবশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৪ সালের মার্চে।

দাম বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বছরের শুরুতে গণশুনানি নিয়েছিল এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

এরপর ছয় মাস পর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে কারওয়ান বাজারে বিইআরসি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ আর খান সিদ্ধান্তের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “কোম্পানিগুলো থেকে প্রস্তাব এসেছিল যে দাম বাড়ানো দরকার। ফেব্রুয়ারিতে আমরা শুনানি নিয়েছিলাম। অনেক কিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি আমরা।”

গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এ আর খান বলেন, “পৃথিবীর আর কোথাও এত কম দামে গ্যাস পাওয়া যায় না।”

বিইআরসি দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার ঘণ্টাখানের মধ্যে বিবৃতি পাঠিয়ে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক দরপতনের মধ্যে সরকারের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ বলেছে জাতীয় পার্টি।

“এই মূল্য বৃদ্ধি হবে দেশের আপামর মানুষের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো,” বলা হয়েছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর বিবৃতিতে।

বামপন্থি দলগুলো বলছে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সিএনজির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে তার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। তাতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এদিকে আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কমলেও স্থানীয় বাজারে কমায়নি সরকার।
বিদ্যুতের দাম বেড়েছে সবক্ষেত্রে

আবাসিক, বাণিজ্যিক, পল্লী- সবক্ষেত্রেই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে একটি ক্ষেত্রে দাম কমানো হয়েছে।

গ্রাহক পর্যায়ে ৬টি ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের প্রতি ইউনিটে ৩ টাকা ৫৩ পয়সার পরিবর্তে এখন ৩ টাকা ৮০ পয়সা হিসেবে বিল দিতে হবে।

তার মানে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে এখন ২০ টাকা ২৫ পয়সা ব্যয় বাড়বে। তবে প্রথম ধাপের পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের জন্য ৭ পয়সা দাম কমিয়ে প্রতি ইউনিট ৩ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ১৩ পয়সা দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৪ পয়সা করা হয়েছে। এই ধাপের সর্বোচ্চ ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ২৫ টাকা।

তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ১৭ পয়সা দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। এই ধাপের সর্বোচ্চ ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ৫১ টাকা।

চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ২১ পয়সা দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। এই ধাপের সর্বোচ্চ ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ৮৪ টাকা।

পঞ্চম ধাপে ৪০১ ইউনিট থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১৯ পয়সা দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। এই ধাপের সর্বোচ্চ ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ১১৪ টাকা।

ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ৫ পয়সা দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৯৮ পয়সা করা হয়েছে। এই ধাপের সর্বনিম্ন ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত গুনতে হবে কমপক্ষে ৩০ টাকা।

কৃষির সেচ পাম্পের জন্য বিদ্যুতের দাম আগে বিতরণ কোম্পানি ভেদে ভিন্ন হলেও একই মূল্যহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুতে প্রতি ইউনিটের মূল্য ছিল ৩ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৯৬ পয়সা। সেপ্টেম্বর থেকে মূল্য হবে ৩ টাকা ৮২ পয়সা। অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রতি ইউনিটের দাম ২ টাকা ৫১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পে ফ্ল্যাট রেট ৭ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা; বাণিজ্যিক ও অফিসের ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। এছাড়া ৩৩ ও ১৩২ কেভির উচ্চচাপ এবং ১১ কেভির মধ্যমচাপ ব্যবহারকারীদেরও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

গ্রাহক পর্যায়ে সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় গত বছরের মার্চে। তখন দাম গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে খুচরা ও পাইকারি মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ১১ দফায়।

নতুন করে দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব নিয়ে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি গণশুনানি শুরু করে বিইআরসি। এতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও কমিশন এতদিন কোনো সিদ্ধান্ত জানাচ্ছিল না।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রয়োজনেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে বলেন এ আর খান।

পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৩২ কেভির জন্য ডিপিডিসি ও ডেসকোর ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে। কমানো হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ, ওজোপাডিকো ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ অঞ্চলগুলোর জন্য। ৩৩ কেভির ক্ষেত্রে সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই পাইকারি দাম বাড়ানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মূল্যহার (হুইলিং চার্জ) ১৩২ কেভি ও ৩৩ কেভি উভয় লাইনের জন্যই বাড়ানো হয়েছে।

সঞ্চালন মূল্য বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এ আর খান বলেন, “পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সঞ্চালন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য বিনিয়োগ করছে। মূল্যবৃদ্ধি তাদের কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।”
সার-বিদ্যুৎ ছাড়া সবক্ষেত্রে বেড়েছে গ্যাসের দাম

গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়িয়েছে বিইআরসি। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে শিল্প কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ক্যাপটিভ)জন্য ব্যবহার করা গ্যাসে। সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ছে না।

আবাসিকে গ্যাসের মাসিক বিল এক চুলার জন্য এখন ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৬৫০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। আগে এই হার ছিল যথাক্রমে ৪০০ ও ৪৫০ টাকা।

গৃহস্থালিতে মিটারভিত্তিক গ্যাসের বিল প্রতি ঘনমিটার ৫ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা করা হয়েছে।

শিল্প কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ (ক্যাপটিভ) উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বিল দ্বিগুণ করে ৪ টাকা ১৮ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে।

শিল্পে গ্যাসের বিল প্রতি ঘনমিটার ৫ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৭৪ পয়সা করা হয়েছে। বাণিজ্যিকে গ্যাসের বিল প্রতি ঘনমিটার ৯ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে।

গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে।

সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১ অগাস্ট আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন সিএনজি ও ইটভাটা ছাড়া সব ধরনের গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়।

গত জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছিলেন।

সূত্র: বিডিনিউজ