প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে জালিয়াতি

0

নিউজ ডেস্ক, টেকজুম ডটটিভি// মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। ক্রমান্বয়ে এসব ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। জালিয়াতদের মোকাবিলায় কাউন্টার প্রযুক্তি না থাকায় এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার্থে গ্রহণ করা যাচ্ছে না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এসব ঘটনার নিষ্পত্তি বা সুরাহা করাও বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে গ্রাহকদের আর্থিক স্বার্থরক্ষাসহ সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত জালজালিয়াতি-সংক্রান্ত বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নানা ধরনের গুরুতর অনিয়ম উদ্ঘাটন করা হয়েছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে সংঘটিত জালিয়াতির ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যাংকের তথ্যভা-ার হ্যাকিং, পরিচিতি চুরি, গোপন নম্বর চুরি, ইলেকট্রনিক লেনদেনের বিভিন্ন প্লাটফরম ব্যবহার করে বিভিন্ন গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সিম ডুপ্লিকেট, কোনিং, ব্লক, কল ডাইভার্ড করে এসব জালিয়াতি করা হচ্ছে।

এসব ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেও মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভিন্ন হওয়ায় আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে যথাযথ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে কললিস্ট, কল লগ, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমস, নেটওয়ার্ক টাওয়ার অনুসরণ করে কোনো সিমের অবস্থান শনাক্তকরণ, কোনো সিমের কল ডাইভার্ড, কোন, ডুপ্লিকেট, ব্লক করা হয়েছে কি না, জালিয়াতির ঘটনায় ব্যবহৃত আইপি ঠিকানা, ম্যাক ঠিকানা, ব্রাউজিং ইতিহাস, ব্যবহৃত মডেমের অবস্থান, নেটওয়ার্ক টাওয়ারের ব্যবহার এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে সংঘটিত জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাতে ইদানীং প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিত্যনতুন প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের জালজালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত জালিয়াতির ঘটনা প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। এটি সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে ব্যাংকগুলোয় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং উদ্ঘাটিত অনিয়মের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এসব অভিনব জালিয়াতির ঘটনা প্রতিরোধে তদন্তের প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন থেকে মোবাইল ফোন অপারেট, ইন্টারনেট প্রোভাইডার সার্ভিস, এগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) থেকে চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত আর্থিক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি ৭টি সংস্থার সমন্বয় সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আলোকে বিটিআরসি অচিরেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা দেবে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুপারভিশন কমিটির সভায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পরিদর্শন ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করছে। এসব পরিদর্শনে ব্যাংকগুলোর অনলাইন লেনদেন পরিচালনায় অনেক দুর্বলতা শনাক্ত করে সেগুলো সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা আমাদের সময়কে বলেন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে জালিয়াতির কিছু ঘটনা ঘটেছে। প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, অটোমেটিক চেক কিয়ারিং ক্ষেত্রে করপোরেট গ্রাহকের এক লাখ টাকা এবং ব্যক্তি ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি চেক হলে তা পেমেন্ট করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জানাতে হবে। এ সিস্টেমকে পজিটিভ পে বলা হয়। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোর এটিএম কার্ড হিসেবে ‘প্লাস্টিক ম্যাগনেটিক স্ট্রিফ’ কার্ড ব্যবহার করছে। এটি থেকে তথ্য চুরি করা যায়। এ কারণে এটি বাদ দিয়ে ‘চিফ বেইসড কার্ড’ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। খুব শিগগির ম্যাগনেটিক স্ট্রিফ কার্ড পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। ফলে এতে নিরাপত্তা বাড়বে। ক্রেডিট কার্ডের অনলাইনে ‘নট প্রেজেন্ট কার্ড’ লেনদেনের জন্য টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন সিস্টেম এবং লেনদেনের পর এসএমএস দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কার্ডভিত্তিক লেনদেনকে আরও নিরাপদ করতে বিশ্বমানের পিসিআইবিএসএস প্রযুক্তি ও সিস্টেম ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা চলছে। মোবাইল ব্যাংকিং নিরাপদ করতে কেন্দ্রীয়ভাবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিদিনের লেনদেন মনিটরিং করা যায় কি না তা নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এটি করতে পারছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনিয়ম হলে পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের অপ্রতুল জনবলের কারণে ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগকে দিয়ে তদন্ত করা হয়। এখন এ পরিদর্শন জোরদার করতে পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগে আলাদা সুপারভিশন বিভাগ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের চারটি শাখায়, ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখায়, প্রাইম ব্যাংকের একটি শাখাসহ আরও কিছু ব্যাংকের শাখায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।

সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শিল্প ভবন শাখার অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংকের লন্ডন শাখার মাধ্যমে আড়াই লাখ ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রায় তিন বছর পরও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। আত্মসাৎ করা টাকা ব্যাংকের হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের কলেজগেট শাখা, কুমিল্লা শাখা, ফেনী শাখায়ও একই ধরনের জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিছু টাকা ব্যাংক আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের সিলেট শাখার একজন গ্রাহকের মোবাইল ফোনের সিম ডুপ্লিকেট করে তার হিসাব থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ধরা পড়েছে। কে কীভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তার কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ব্যাংক গ্রাহকের টাকা দিয়ে দিয়েছে। আরও একটি বেসরকারি ব্যাংকের তথ্যভা-ার হ্যাক করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একটি তহবিল গঠন করে পরে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা মোবাইল অ্যাপস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান বলেন, ই-ব্যাংকিংয়ে কিছু ঝুঁকি আছে। এ জন্য ব্যাংক এককভাবে দায়ী নয়। পাসওয়ার্ড বা পিনকোড সযতেœ রাখা গ্রাহকের দায়িত্ব। কোনোভাবে এটি চুরি হয়ে গেলে তখন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে স্বাভাবিকভাবেই টাকা অন্যত্র চলে যাবে বা অন্য কেউ তুলে নেবে।
সম্প্রতি এটিএম কার্ডের লেনদেন সমস্যা, জালজালিয়াতি ও প্রতিরোধ নিয়ে ‘ইন্ট্রাডাকশন অব দ্য বায়োমেট্রিক এটিএম কার্ড ইন দ্য ব্যাংকিং সেক্টর অব বাংলাদেশ : অ্যা ডিজিটাল ওয়ে টু রিডিউস দ্য ডিজিটাল ক্রাইম’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনেও জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, এটিএম কার্ডের লেনদেনেও কার্ড ও পিনকোড চুরি করে টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন তথ্যভা-ার থেকে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও বুথে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও থেকে পিনকোড চুরি করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। জরিপভিত্তিক গবেষণাটি করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক তাসলিমা আখতার ও আরিফিন ইসলাম। ব্যাংকার, ডাক্তার, গবেষক, শিক, শিার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ১৮০ জন এটিএম কার্ড ব্যবহারকারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল চোরেরা ৪৩ জন গ্রাহকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে। এ সংখ্যা জরিপে অংশগ্রহণকারীর ২৪ শতাংশ। এটিএম কার্ডে জালিয়াতির ঘটনা শুনেছেন ২৮ গ্রাহক, যা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে ডিজিটাল চোরের খপ্পরে পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে ৪০ শতাংশ গ্রাহকের।

এ বিষয়ে জরিপকারী প্রভাষক তাসলিমা আখতার ও আরিফিন ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা প্রশ্ন পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যাগুলো জানতে পেরেছি। যে প্রক্রিয়ায় পিনকোড চুরি এবং লেনদেন হচ্ছে এটি দুষ্কৃতীদের পে খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়। তাই আমরা মনে করছি, উন্নত প্রযুক্তির বায়োমেট্রিক কার্ড ব্যবহার করলে চুরি ও জালজালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন