শিশুদের নেতিবাচক ইন্টারনেট ব্যবহার জাতি গঠনের পথকে ‘রুদ্ধ’ করবে

0

ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাহুলের বয়স এগারো। দিনের ক্লাস আর পড়াশুনার বাইরে বাকি সময়টাই তার কাটে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বাবা-মায়ের বারণ শোনা তো দূরের কথা এটি তার নেশার মতো হয়ে গেছে বলে অভিযোগ তার বাবা ইসমাইল চৌধুরীর। তিনি বলেন, ‘একবার বাসায় ইন্টারনেটের লাইন কেটে দিয়েছিলাম কিন্তু ছেলে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেওয়ায় আমাকে আবারও ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হয়েছে। আমার ছেলে ইন্টারনেটের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।’

অন্যদিকে জারিফ নামের মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ এক শিক্ষার্থীর বাবা বলছিলেন, ‘ছেলেকে কোচিংয়ে না পাঠিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাসায় শিক্ষক রেখেছিলাম। কিন্তু এরপরও বাইরে আড্ডা দিচ্ছিলো ছেলে। আবদার করে বলল- বাবা, মোবাইল কিনে দিলে আর বাইরে আড্ডা দিব না। সেই ভাবনা থেকেই ছেলেকে মোবাইল কিনে দিলাম। ছেলে বাইরে আড্ডা দেওয়া বন্ধ করল ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে বন্ধ করল পড়াশুনাও। এখন আর ছেলে বাইরে তেমন যায় না, পড়াশুনাও করে না, সারাদিন শুধু ফেসবুক নিয়েই বসে থাকে।’

এই অবস্থা শুধু রাহুল কিংবা জারিফের নয়। সম্প্রতি রাজধানীর কয়েক’শ শিক্ষার্থীর ওপর সময় টেলিভিশনের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর শতকরা ৮০ শতাংশ শিশুই বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে শতকরা ৬৪ শতাংশ ব্যবহার করছে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য এবং ৩৬ শতাংশ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে।

জরিপে আরও দেখা যায়, ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিজের স্মার্টফোন আছে। ফেসবুক একাউন্ট আছে ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর এবং শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

শিশুরা যখন বিনোদনের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তখন তার মধ্যে ইতিবাচক ব্যবহারের চাইতে নেতিবাচক ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘একজন শিশু গান শুনে কিংবা উপন্যাস পড়েও বিনোদন নিতে পারে। কিন্তু যখন সে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে তখন সে নেতিবাচক ব্যবহারটাই বেশি করবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো সে সব সময় সহজ বিনোদন খুঁজে। আর এই বিনোদন নেওয়ার জন্য যখন শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাবে তখন বিভিন্ন পর্ণ সাইট ব্যবহার করবে। একবার যখন কোনো শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যাবে তখন ওই অবস্থার মধ্য থেকে তার বের হওয়ার সুযোগটা অনেক কম থাকবে। এখানে বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাঁড়াবে’ বলেন তিনি।’

তবে শুধুমাত্র পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়া নয় বরং শিশুদের অধিক সময় ইন্টারনেট ব্যবহারই জাতি গঠনের পথকে রুদ্ধ করতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজে ইন্টারনেট প্রবেশ করেছে। এর ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। তবে অধিকাংশ শিশুই দিন কাটায় গেমস খেলে। এটা জাতি গঠনের ক্ষেত্রে খুবেই ধ্বংসাত্মক একটি ব্যাপার।’

তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশ অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় শিশুদের প্রতি নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে তারা কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। তারা যে শুধুমাত্র খারাপ শিক্ষা নিচ্ছে এমনটি নয় বরং অনেকেই জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে এই ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে। দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হচ্ছে এই শিশুরা। আর তারাই যদি ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে বিপথে পরিচালিত হয় তবে তা আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গঠনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ড. মো. কায়কোবাদ বলেন, ‘এতো বেশি প্রযুক্তি নির্ভরতা সমাজে একটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ, এই শিশুরা মানুষের সঙ্গে মিশতে না শিখে বরং ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সময় কাটানো শিখছে। সে মানবিক সমাজে না বেড়ে বরং সাইবার সমাজের মধ্যে বড় হচ্ছে।’

একটা সময় জাতির ভার উঠবে এই শিশুদের হাতে। তাই তারা যদি ইন্টারনেট ব্যবহার করে কুপথগামী হয়ে গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে বলেও মনে করেন এ শিক্ষাবিদ।

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে সমাজ বিপথে পরিচালিত হতে পারে বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার পরও এর ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও প্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘শিশুরা সামাজিক কার্যক্রম বন্ধ করে যখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে সেটি সমাজের জন্য খারাপ ফল বয়ে নিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েই এর সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের এমন পথে যাওয়া প্রয়োজন যেখানে শিশু ইন্টারনেটও ব্যবহার করবে এবং তাদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়বে না।’

সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ইন্টারনেটের যেসব দিক শিশুদের জন্য ক্ষতিকর সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পথ প্রযুক্তিতে রয়েছে। সেই পথকে আমাদের এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে যাতে করে শিশুরা ইন্টারনেটের মধ্যে বেড়ে উঠেও এর ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রভাবমুক্ত থাকে।’

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন