হিটলার এ. হালিম// মোবাইল এবং ফিক্সড দুই ধরনের ইন্টারনেটের দাম কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নয়, ইন্টারনেট পরিবহনে (উৎস থেকে গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছানো) যেসব অণুষঙ্গ জড়িত সেসবেরও ব্যয়ও আনুপাতিক হারে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কমানো হতে পারে ট্রান্সমিশন ও ব্যাকহল চার্জ। এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটরগুলো আরও কম দামে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, ইন্টারনেটের মূল উপাদান ব্যান্ডউইথ ক্রয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় হয় তাদের মোট ব্যয়ের মাত্র ৭-৮ শতাংশ। অথচ বছরের পর বছর শুধু ব্যান্ডউইথের দামই কমিয়েছে সরকার। সঙ্গে যে আরও অন্তত ১৬টি ফ্যাক্টর জড়িত, সেসবের দাম কমানো হয়নি। ফলে ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর সুফল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কখনোই পায়নি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এম. রায়হান আকতার জানান, ব্যান্ডউইথ ট্রান্সমিশন চার্জ ও ব্যাকহল চার্জের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিষয় দুটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সুপারিশ জানানো হবে। তিনি বলেন, টেলিযোগাযোগ বিভাগের পাশাপাশি বিটিআরসিও (টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা) বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে। যে সুপারিশ আসবে তার পরিপ্রেক্ষিতে এ দুটি বিষয়ের (ট্রান্সমিশন ও ব্যাকহল চার্জ) দাম আনুপাতিক হারে কমানোর জন্য সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। ব্যান্ডেউইথের দাম একাধিকবার কমানো হলেও এই বড় ফ্যাক্টর দুটির দাম না কমানোয় ইন্টারনেটের দাম আশানুরূপভাবে এখনও কমেনি বলে তিনি জানান।

এদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বার বার বলে এসেছে, ব্যান্ডউইথের দাম শূন্য করে ফেলা হলেও ইন্টারনেটের দাম কমবে না, যতক্ষণ না সরকার বাকি ফ্যাক্টরগুলোর দাম কমায়।

ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, আমাদের মোট খরচের মাত্র ৭-৮ শতাংশ ব্যয় হয় ব্যান্ডউইথে। ৯৩-৯২ শতাংশ ব্যয় হয় অন্যান্য কাজে। ফলে শুধু ব্যান্ডউইথের দাম কমালেই তা ইন্টারনেটের দামে খুব একটা প্রভাব ফেলে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ব্যান্ডউইথ পরিবহনে কতগুলো বিশেষ পক্ষ জড়িত থাকে। এরমধ্যে রয়েছে, ইন্টারনেট ট্রানজিট (আইপি ক্লাউড), বিদেশি ডাটা সেন্টারের ভাড়া, দেশি-বিদেশি ব্যাকহল চার্জ, ল্যান্ডিং স্টেশন ভাড়া, কেন্দ্রীয় সার্ভারে পরিবহন খরচ, গেটওয়ে ভাড়া, আইএসপি প্রতিষ্ঠানের পরিচলন ব্যয়, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক ভাড়া, ইন্টারনেট যন্ত্রাংশের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক, বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগি ইত্যাদি।

সূত্রগুলো আরও জানায়, এর আগে ইন্টারনেটের দাম কমাতে ‘সমন্বিত’ উদ্যোগের কথা জানা গেছে। এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার কথা সরকার, বিটিআরসি, মোবাইলফোন অপারেটর ও আইএসপিগুলোর।

জানা যায়, এবার আইএসপিগুলো সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই প্রস্তাবনার বিষয়ে এম এ হাকিম বলেন, আমরা ব্যান্ডউইথ কিনি আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) থেকে। আইআইজিগুলো সরকারের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি করে ভ্যাটসহ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই করের বোঝা আমাদের বহন করতে হয়। এই কর কমানো হলে ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, অবৈধ আইএসপি বন্ধ এবং ডিপিডিসি ও ডেসকো যেসব এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহনের লাইন টেনেছে ওইসব লাইনের সঙ্গে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হলে কম খরচে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার ব্যান্ডউইথের দাম কমালে আমরা ইন্টারনেটের দাম না কমিয়ে ‘গতি’ বাড়িয়ে দিই। ফলে গ্রাহক কোনওভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না।

অন্যদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইন্টারনেটের দাম সহনীয় পর্যায়’ আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এক অনুষ্ঠানে বলেন, ইন্টারনেটের দাম সরকার বেঁধে দেবে। দেশে মোবাইলফোনের ভয়েস কলের উচ্চসীমা ও নিম্নসীমা বেঁধে দেওয়া হলেও ইন্টারনেটের দাম বিটিআরসি নির্দিষ্ট করে দেয়নি। ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দিলে গ্রাহকরা কম দামে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে ইন্টারনেটের দাম নির্ধারণে অনেকদিন ধরে কাজ করছে বিটিআরসি। ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ে দাম বেঁধে দিতে ‘কস্ট মডেলিং’-এর পথে অগ্রসর হলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন