মাত্র কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের বাজারে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় একটি মোটামুটি চলনসই অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন পাওয়া যেত। কিন্তু সাধারণ ও নিম্ন-আয়ের মানুষের প্রযুক্তিগত নাগালের মধ্যে থাকা সেই দিনগুলো হয়তো দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর আকস্মিক উত্থান এবং বৈশ্বিক মেমোরি চিপের তীব্র সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে সস্তা ও বাজেট স্মার্টফোন উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ (Counterpoint Research)-এর সাম্প্রতিক বিস্ফোরক তথ্যের বরাতে এই সংকটের গভীরতা এবং বাংলাদেশের বাজারের ভবিষ্যৎ সমীকরণ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন শিপমেন্টের রেকর্ড
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক স্মার্টফোন শিপমেন্ট গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। ফলে মোট স্মার্টফোন সরবরাহের সংখ্যা নেমে আসতে পারে মাত্র ১.০৮ বিলিয়ন ইউনিটে— ২০১৩ সালের পর যা বৈশ্বিক বাজারে সর্বনিম্ন। তবে এই মন্দা কেবল সাধারণ কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সংকট।
এআই (AI) এর উত্থান এবং মেমোরি চিপের হাহাকার
স্মার্টফোনের কার্যক্ষমতা সচল রাখার প্রধান ফুসফুস হলো এর ভেতরে থাকা LPDDR4 এবং LPDDR5 মেমোরি চিপ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এই চিপগুলোর সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-র মতো বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুলের অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে।
এই ডেটা সেন্টারগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তির এবং চড়া দামের ‘এইচবিএম’ (HBM) ও সার্ভার ড্র্যাম (Server DRAM)। স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের মতো শীর্ষ চিপ নির্মাতারা এখন কম লাভজনক সাধারণ স্মার্টফোনের মেমোরি উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে, বেশি মুনাফার এই এআই-সার্ভার চিপ তৈরির দিকে ঝুঁকছে। ফলস্বরূপ, ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে সাধারণ মোবাইল মেমোরির দাম একলাফে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
১৫০ ডলারের নিচে ফোন উধাও হওয়ার শঙ্কা
এই চিপ সংকটের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসবে এন্ট্রি এবং বাজেট লেভেলের স্মার্টফোনগুলোতে। কাউন্টারপয়েন্ট জানাচ্ছে, বিশ্ববাজারে LPDDR4 মেমোরির সরবরাহ যদি ৪০ শতাংশের বেশি কমে যায়, তবে ১৫০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা) বা তার নিচের স্মার্টফোনগুলো বাজার থেকে কার্যত পুরোপুরি উধাও হয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নাজুক ও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টেকনো (TECNO), ইনফিনিক্স (Infinix), আইটেল (itel) এবং এদের মূল মাদার কোম্পানি ট্রানশান (Transsion)-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো। বাংলাদেশ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো উন্নয়নশীল বাজারে এই ব্র্যান্ডগুলো বছরের পর বছর ধরে সস্তা মেমোরির ওপর ভর করে সাশ্রয়ী ফোন বিক্রি করে একচেটিয়া ব্যবসা ও বিশাল গ্রাহক ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু মেমোরির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এখন তাদের পুরো বিজনেস মডেলই হুমকির মুখে। কাউন্টারপয়েন্টের প্রধান বিশ্লেষক ইয়াং ওয়াং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে স্পষ্ট বলেছেন— “এটা শুধু বাজার বড় হওয়া না হওয়ার প্রশ্ন নয়; অনেক ব্র্যান্ডের জন্য এটা এখন টিকে থাকার লড়াই।”
ব্র্যান্ডভেদে ভিন্ন চিত্র: শাওমির বড় পতন, ব্যতিক্রম হুয়াওয়ে
স্মার্টফোন বাজারের এই সংকট কিন্তু সব কোম্পানির জন্য এক নয়। অ্যাপল (Apple) এবং স্যামসাং (Samsung)-এর মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা মূলত প্রিমিয়াম ও ফ্ল্যাগশিপ বাজারে রাজত্ব করায় তাদের সরবরাহ চেইন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মুনাফার মার্জিনও অনেক বেশি। ফলে মেমোরির দাম বাড়লেও তারা তা সহজেই সামাল দিতে পারবে।
তবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। মেমোরি সংকটের কারণে শীর্ষ চীনা ব্র্যান্ড শাওমি (Xiaomi)-এর বৈশ্বিক শিপমেন্ট ২৮ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়তে পারে। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেও সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রমী চমক দেখাচ্ছে হুয়াওয়ে (Huawei)। মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নিজস্ব প্রযুক্তি কাঠামো ও স্বাধীন সেমিকন্ডাক্টর শৃঙ্খল গড়ে তোলার কারণে হুয়াওয়েই একমাত্র বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, যাদের শিপমেন্ট এই সংকটকালীন বছরেও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকল্প সমাধান: রিফারবিশড ও সেকেন্ড-হ্যান্ড বাজারের উত্থান
নতুন ভালো মানের স্মার্টফোন যখন সাধারণ ক্রেতাদের আর্থিক নাগালের বাইরে চলে যাবে, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যবহৃত বা পুরোনো ফোনের দিকে ঝুঁকবে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী রিফারবিশড (কারখানায় পুনরায় মেরামত করা) এবং সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মার্টফোনের বাজার ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
আশার আলো ও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস
তবে এই প্রযুক্তিগত সংকট চিরস্থায়ী হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন বাজার গবেষকরা। ধীরে ধীরে মোবাইল মেমোরি উৎপাদন আবার স্বাভাবিক লাইনে ফিরবে এবং ক্রেতাদের আটকে থাকা চাহিদাও একসময় বাজারে প্রভাব ফেলবে। কাউন্টারপয়েন্টের হিসাব অনুযায়ী, এই দশকের শেষের দিকে ২০২৮ সালের পর থেকে ‘সিক্সজি’ (6G) প্রযুক্তির হাত ধরে নতুন একটি আপগ্রেড সাইকেলের মাধ্যমে বিশ্ব স্মার্টফোন বাজার আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
২০২৮ সালের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির হলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সময়টি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমাদের দেশের সিংহভাগ ক্রেতাই যেখানে বাজেট এবং লোয়ার মিড-রেঞ্জ সেগমেন্টের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সামনের দুটো বছর নতুন স্মার্টফোন কেনা বা আপগ্রেড করা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল একটি বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। দেশীয় স্মার্টফোন সংযোজনকারী (Local Assembly) কারখানাগুলো এই চিপ সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



















