সরকারি ভাতা বিতরণ ব্যবস্থায় সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানের মধ্যে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের (পরিবর্তিত নাম নগদ লিমিটেড) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ মিশুক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবিরের আদালত এ আদেশ দেন। ১৩ সেপ্টেম্বর, রবিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে দুদকের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার অবরুদ্ধের নির্দেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এসব শেয়ারের অভিহিত মূল্য ৭৮৬ কোটি ৩৯ হাজার ২৮৪ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩২ হাজার ৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি সরকারি ভাতা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ ‘নগদ’-এর ই-মানি হিসেবে গ্রাহকের ওয়ালেটে জমা হওয়ার কথা।
তবে যেসব গ্রাহক এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভাতা উত্তোলন করেননি—মৃত্যু, পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া বা অন্য কোনো কারণে—তাদের ওয়ালেট থেকে সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে ই-মানি সরিয়ে নেওয়া হতো বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রথমে এসব অর্থ ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেটে এবং পরে ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও (DSO) ওয়ালেটে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ট্রাস্টকাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ‘রিফান্ড’-এর নামে ১ হাজার ৭০৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
এর মধ্যে শুধু আটটি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমেই প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অর্থ ‘লেয়ারিং’ করে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের নামে থাকা ১৬ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শেয়ার কেনা হয়। এসব শেয়ার মিয়ার্স হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ১১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি শেয়ার, ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে ২ কোটি ৫৭ লাখের বেশি শেয়ার এবং ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস লিমিটেড, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ারসহ মোট ১০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ধারণ করা আছে বলে দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের আবেদনে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা এসব শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচারের অপচেষ্টা করছেন। শেয়ারহোল্ডারদের বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা নাগরিক হিসেবে দেখানো হলেও বিদেশ থেকে শেয়ার কেনার অর্থ আসার কোনো তথ্য অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ১৪ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ১৮ বিধি অনুযায়ী, এসব শেয়ার দ্রুত অবরুদ্ধ করা না হলে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে আদেশের কপি নিবন্ধক (যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহ), ‘নগদ’-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেনের মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) পরিচালনার জন্য ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডকে মাস্টার এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের ৫১ শতাংশ এবং থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের ৪৯ শতাংশ পাওয়ার কথা ছিল।
পরবর্তীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ করে। তানভীর আহমেদ মিশুক ও তাঁর স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।


















