কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তারে মেমোরি চিপ ও সার্ভার স্টোরেজের চাহিদা বেড়েছে বিশ্বজুড়ে। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১০৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান উওন। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক প্রান্তিকে কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি নতুন রেকর্ড।
একই সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত রাজস্ব আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন উওনে। এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের কারণে উচ্চগতির মেমোরি চিপ, সার্ভার এসএসডি ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা বৃদ্ধিকে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চিপ ব্যবসায় রেকর্ড আয় ও মুনাফা
স্যামসাংয়ের ডিভাইস সলিউশনস (DS) বিভাগ এই আর্থিক সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি। বিভাগটির আয় হয়েছে ১৪৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন উওন এবং পরিচালন মুনাফা ১০৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন উওন।
বিশেষ করে উচ্চ ব্যান্ডউইডথ মেমোরি বা HBM4 চিপ এবং সার্ভারভিত্তিক এন্টারপ্রাইজ এসএসডির বিক্রি বেড়েছে। এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার মেমোরি সরবরাহে এ ধরনের চিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকায় ২০২৭ সালেও মেমোরি চিপের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে চিপ সরবরাহের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২৯ ট্রিলিয়ন উওন বিনিয়োগ
চিপ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে তৃতীয় প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের মূলধনী ব্যয় বা ক্যাপেক্স দাঁড়িয়েছে ২৯ ট্রিলিয়ন উওন। এর মধ্যে ২৭ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন উওন ব্যয় করা হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বিভাগে এবং ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন উওন স্যামসাং ডিসপ্লেতে।
ফাউন্ড্রি ব্যবসায়ও নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে চিপ উৎপাদন এবং উন্নত এনপিইউ চিপের চাহিদা পূরণে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের টেলর শহরে নির্মাণাধীন কারখানায় ২০২৭ সাল থেকে ২ ন্যানোমিটার ও ৪ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্যামসাংয়ের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
স্মার্টফোন বিভাগে লোকসানের চাপ
চিপ ব্যবসায় রেকর্ড মুনাফা হলেও স্যামসাংয়ের মোবাইল এক্সপেরিয়েন্স (MX) ও নেটওয়ার্কস বিভাগে চাপ রয়েছে। এ দুই বিভাগের সম্মিলিত রাজস্ব হয়েছে ৩৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন উওন। তবে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিভাগটি ০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন উওন পরিচালন লোকসানে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বছরের শেষ প্রান্তিকে স্মার্টফোন বিক্রি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এ জন্য Galaxy Z Fold8, Z Fold8 Ultra এবং Galaxy S26 সিরিজের বিপণনে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্যামসাং ডিসপ্লে (SDC) বিভাগ তৃতীয় প্রান্তিকে ৮ ট্রিলিয়ন উওন রাজস্ব এবং ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন উওন পরিচালন মুনাফা করেছে। প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের জন্য OLED প্যানেল সরবরাহ এই বিভাগের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় অঙ্কের লভ্যাংশ
আর্থিক সাফল্যের অংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার পরিকল্পনাও জানিয়েছে স্যামসাং। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ও পছন্দের প্রতি শেয়ারের বিপরীতে ৪ হাজার ৬০১ কোরিয়ান উওন করে লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। এতে মোট লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩০ ট্রিলিয়ন উওন।
২০২৬ অর্থবছরে শেয়ার পুনঃক্রয় বা বাইব্যাক এবং নগদ লভ্যাংশ মিলিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের ৯০ থেকে ১১০ ট্রিলিয়ন উওন ফেরত দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে, এআই প্রযুক্তির বিস্তার স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। তবে চিপ ব্যবসার এই সাফল্য স্মার্টফোন ও অন্যান্য বিভাগে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।






















