চালকবিহীন গাড়ির জগতে সবচেয়ে বড় নাম টেসলা তাদের স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি পরিষেবা ‘রোবোট্যাক্সি’-তে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি অস্টিন শহরে চলাচলকারী রোবোট্যাক্সিগুলোতে চালকের আসনে এখন একজন ‘সেফটি মনিটর’ বা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষককে বসানো হচ্ছে। যদিও গাড়িটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মোডেই চলে, তবে জরুরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করার জন্য এখন থেকে একজন মানুষ চালকের আসনেই উপস্থিত থাকবেন।
টেসলার এই পদক্ষেপটি প্রযুক্তি এবং স্বয়ংচালিত যানবাহনের জগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে যখন অস্টিনে টেসলার রোবোট্যাক্সি সেবা চালু হয়, তখন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক যাত্রীর আসনে বসতেন, যা দেখে মনে হতো গাড়িটি সত্যিই চালকবিহীন। কিন্তু এখন চালকের আসনে মানুষ বসানোর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই টেসলার কৌশল বদলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
কেন এই পরিবর্তন?
টেসলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের রোবোট্যাক্সি পরিষেবা এখন শহরের সাধারণ রাস্তার পাশাপাশি হাইওয়েতেও চলাচল শুরু করেছে। এই সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে “অতিরিক্ত সতর্কতা” হিসেবেই চালকের আসনে পর্যবেক্ষক রাখার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি একটি “স্ব-আরোপিত সতর্কতামূলক প্রথম পদক্ষেপ” বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বিশ্লেষকরা এর পেছনে আরও দুটি বড় কারণ খুঁজে পেয়েছেন:
১. নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ: রোবোট্যাক্সি পরিষেবা চালু হওয়ার পর থেকেই বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে গাড়িটি অপ্রত্যাশিতভাবে ব্রেক করেছে, ভুল লেনে চলে গেছে বা বাঁক নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষককে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে চালকের আসনে বসে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। এই ঘটনাগুলো টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ (FSD) প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
২. নতুন আইন: সম্প্রতি টেক্সাসে স্বয়ংচালিত যানবাহন সংক্রান্ত একটি নতুন আইন (SB 2807) কার্যকর হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তার ওপর আরও কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, লেভেল ৪ বা তার বেশি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে একজন মানব অপারেটরের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। টেসলার FSD প্রযুক্তি কাগজে-কলমে লেভেল ২ পর্যায়ের হওয়ায়, নতুন আইনের আওতায় তাদের চালকের আসনে পর্যবেক্ষক রাখা ছাড়া উপায় ছিল না বলে মনে করছেন অনেকে।
চালকবিহীন ভবিষ্যতের দিকে এক ধাপ পিছিয়ে আসা?
যদিও টেসলা বলছে এটি একটি অস্থায়ী এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, সমালোচকরা বলছেন এটি চালকবিহীন গাড়ি তৈরির দৌড়ে টেসলার এক ধাপ পিছিয়ে আসারই নামান্তর। ওয়েমো (Waymo)-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাগুলো যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং HD ম্যাপিং-এর ওপর নির্ভর করে ধীরে ধীরে চালকবিহীন পরিষেবা বাড়াচ্ছে, সেখানে টেসলা শুধুমাত্র ক্যামেরা-ভিত্তিক সিস্টেম দিয়ে দ্রুত বাজার দখলের চেষ্টা করছিল।
এই নতুন পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং নিরাপদ একটি চালকবিহীন গাড়ি তৈরি করা এখনও কতটা চ্যালেঞ্জিং। নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত না করে শুধু চমক দিয়ে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করা কঠিন—টেসলার এই সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।





















