মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪২ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ১০ শতাংশের কাছাকাছি। তার আগের বছর খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ শতাংশেরও নিচে।
খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফনের কারণে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর্থিক চাপের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আয়-ব্যয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং আমানত প্রত্যাহারের চাপের মধ্যে ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রিমিয়ার ব্যাংক ৬৭৭ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।
১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা তৃতীয় প্রজন্মের এই ব্যাংকটি দীর্ঘদিন তুলনামূলক ভালো ভাবমূর্তি ধরে রাখলেও সাম্প্রতিক আর্থিক সূচকগুলোতে তার বিপরীত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল ২৬ বছর দায়িত্ব পালনের পর পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর থেকেই ব্যাংকের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হতে থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণের একটি বড় অংশ মাত্র ২৪ জন গ্রাহকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। এই গ্রাহকদের অনেকেই বর্তমানে খেলাপি। শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের তালিকায় রয়েছে বসুন্ধরা, ব্লু প্ল্যানেট, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং, কর্ণফুলী, ক্রনি, ভিনসেন কনসালট্যান্সি, জাজ ভূঁইয়া, আব্দুল মোনেম লিমিটেড, সাদ মুসা, এসিআই, ডায়মন্ড ও ডরিন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ব্যবসার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং ঋণ আদায় কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়। পাশাপাশি ঋণ শ্রেণিকরণের নীতিমালা কঠোর করায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাত সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে। উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান করা হয়। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বেই ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ৩৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকায়।
চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, ব্যাংকের বর্তমান দুর্বল আর্থিক অবস্থা মূলত বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমতে শুরু করেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের সময়ে ব্যাংকে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার, অতিরিক্ত সুদে আমানত গ্রহণ, জব্দ হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন এবং বিজ্ঞাপনের নামে তহবিল আত্মসাৎ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, ২০২০ সাল থেকে ৪০ মাসের বেশি সময় ধরে বনানীর ইকবাল সেন্টারের দুটি ফ্লোরের ভাড়া বাবদ ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও ব্যাংক ওই ফ্লোরগুলো ব্যবহার করেনি। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ও সাবেক চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন ভবনে অবস্থিত, যা ব্যাংকিং বিধির পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া বিএফআইইউর তদন্তে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও ক্রেডিট কার্ড অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞাপন তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
বর্তমানে প্রিমিয়ার ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট চলছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রস্তুতিও চলছে।






















