মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর করেছেন। আদালতের রায়ে তার আগের নেয়া অনেকগুলো কঠোর শুল্ক পদক্ষেপ অবৈধ ঘোষিত হলেও, প্রেসিডেন্ট দমে না গিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
গত শনিবার থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন শুল্ক নীতিতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প তার প্রাথমিক ঘোষণার চেয়েও উচ্চহারে কর বসিয়েছেন। মূলত ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘১২২ ধারা’ ব্যবহার করে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এভাবে ব্যবহার করেননি। এই আইনের অধীনে তিনি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারেন এবং তা ১৫০ দিন পর্যন্ত কার্যকর রাখতে পারেন, যদি না মার্কিন কংগ্রেস এর মেয়াদ বৃদ্ধি করে। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস।
বর্তমান এই শুল্কের তালিকায় পণ্য এবং দেশ উভয়কেই আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পণ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বিদেশী ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং তামার ওপর, যার ওপর শুল্ক হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যানবাহন খাতের ওপরও বড় আঘাত এসেছে; আমদানি করা গাড়ি এবং ভারী ট্রাকের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া নির্মাণ ও আসবাবপত্র শিল্পে ব্যবহৃত কাঠ, রান্নাঘর ও বাথরুমের ক্যাবিনেট এবং শৌখিন আসবাবপত্রকেও এই বাড়তি করের আওতায় আনা হয়েছে।
মানচিত্রের কমলা চিহ্নিত দেশগুলোতে নতুন শুল্কের হার বেশি, ধূসর অংশে অপরিবর্তিত এবং সবুজ চিহ্নিত দেশগুলোতে শুল্কের হার আগের চেয়ে কম। উৎস: নিউ ইয়র্ক টাইমস
আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণ হিসেবে পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ওপরও নতুন করে শুল্ক বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, নির্দিষ্ট কিছু কৃষিপণ্য (যেমন: গরুর মাংস, টমেটো, কমলা) এবং জ্বালানি তেলকে আপাতত এই সাধারণ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
দেশ হিসেবে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু এখন চীন। ফেন্টানাইল পাচার রোধে ব্যর্থতা এবং বাণিজ্যিক বৈষম্যের অভিযোগে বেইজিংয়ের ওপর ১০ শতাংশ মূল শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ‘ফেন্টানিল শুল্ক’ বসানো হয়েছে।
একইভাবে প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোও ট্রাম্পের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। ফেন্টানিল চোরাচালান বন্ধ করতে না পারার অভিযোগে মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ এবং কানাডার ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। যদিও মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকের ওপর শুল্কের হার আগের চেয়ে কমেছে, তবুও উত্তর আমেরিকান বাণিজ্যিক চুক্তি (ইউএসএমসিএ) নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো উচ্চ শুল্ক হারের (কমলা চিহ্নিত) মুখে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাথে হওয়া আগের চুক্তিগুলোও এখন অনিশ্চয়তার মুখে, যেখানে ১৫ শতাংশ শুল্কের একটি ভিত্তি ধরা হয়েছে।
ট্রাম্পের এই কঠোর বাণিজ্য নীতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে তিনি যেমন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি এবং মার্কিন উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে এই বাড়তি শুল্কের বোঝা সাধারণ আমেরিকানদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন বলে সমালোচনা হচ্ছে। আমদানিকারকরা যখন বাড়তি কর দিয়ে পণ্য আনবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকান বাজারে ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে আসবাবপত্র—সবকিছুর দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করলেও ট্রাম্পের এই ‘প্যাচওয়ার্ক’ বা তালি দেয়া শুল্ক নীতি প্রমাণ করে যে, তিনি আমেরিকার বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নিজের শর্তে ঢেলে সাজাতে বদ্ধপরিকর।






















