ভ্যাট প্রত্যাহার, দ্রুত পরিবর্তনশীল শহুরে জীবনধারা এবং পণ্যের গুণগত মানের ওপর ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলে দেশের সুপারমার্কেট চেইনগুলোতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সময়ের ‘অভিজাতদের বাজার’ হিসেবে পরিচিত এই মাধ্যমটি এখন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠছে।
জোয়ারে ভাসছে সংগঠিত খুচরা খাত
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে স্থানীয় বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের বিপুল বিনিয়োগ বাংলাদেশের এই খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বড় শহরগুলোতে গ্রাহকরা এখন ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজারের তুলনায় সুপারমার্কেটের সুবিধা, স্বাস্থ্যবিধি এবং সুসংগঠিত পরিবেশকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
শীর্ষ চেইনগুলোর ব্যাপক বিস্তার
দেশের বৃহত্তম সুপারমার্কেট চেইন ‘স্বপ্ন’ গত তিন বছরে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ও আউটলেটের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করেছে। তিন বছর আগে যেখানে তাদের দোকানের সংখ্যা ছিল ৫০৭টি, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,০০০-এ। ২০২৩ সালে তাদের দৈনিক গড় ক্রেতা সংখ্যা ছিল ৬৫-৭০ হাজার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজারে।
স্বপ্নের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ বলেন, “২০২৪ সালের শেষের দিকে সুপারমার্কেটগুলোর ওপর থেকে অতিরিক্ত ভ্যাট প্রত্যাহার গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মানুষ এখন বোঝে যে সুপারমার্কেট শুধু ধনীদের জন্য নয়। উন্নত কোল্ড-চেইন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় সব আয়ের মানুষ এখন আমাদের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।”
কেন ঝুঁকছেন ক্রেতারা?
খুচরা ব্যবসা বিশেষজ্ঞরা এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছেন। পরিবার ছোট হয়ে আসা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতারা এখন কম সময়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কেনাকাটা সারতে চান।
বাটা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল বিশ্লেষক ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, “ভোক্তারা এখন দক্ষতা, গুণমান এবং পছন্দের স্বাধীনতা চান। তারা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিড় ঠাসা কাঁচাবাজারে কাটাতে চান না। ডিজিটাল পেমেন্ট এবং লয়্যালটি প্রোগ্রামের সুবিধাও আধুনিক রিটেইল চেইনগুলোকে জনপ্রিয় করছে।”
মূল্য ব্যবধান হ্রাস ও নতুন বিনিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের কর ছাড়ের ফলে প্রথাগত বাজার ও সুপারমার্কেটের মধ্যে পণ্যের মূল্যের ব্যবধান কমে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য সুপারমার্কেটে কেনাকাটা বিলাসিতার পরিবর্তে এখন প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে।
এই বিশাল সম্ভাবনা দেখে পুরনো ব্র্যান্ড যেমন আগোরা, মীনা বাজার এবং ইউনিমার্ট তাদের সম্প্রসারণ কার্যক্রম নতুন করে শুরু করেছে। একই সাথে প্রাণ-আরএফএল, আকিজ এবং মেঘনা গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এই বাজারে আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে। এমনকি মিতসুবিশি কর্পোরেশনের মতো বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভোক্তা অর্থনীতিতে আস্থা রেখে বাজারে প্রবেশ করছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট খুচরা বাজারের মাত্র ৫ শতাংশ সংগঠিত খাতের দখলে থাকলেও, দ্রুত নগরায়ন এবং ভোক্তার অভ্যাস পরিবর্তনের ফলে এই হার আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকার ক্রমবর্ধমান পেশাজীবী শ্রেণির কাছে ‘সুবিধাজনক অর্থনীতি’ এখন মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।




















