চট্টগ্রামের আমদানিকারক নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠানের নামে ১.০৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২.৩৬ কোটি টাকার পণ্য আমদানির রেকর্ডও রয়েছে। কিন্তু এই ব্যবসায়ী বলছেন, তিনি ঋণের টাকা বা আমদানিকৃত পণ্য—কোনোটিই হাতে পাননি।
ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় এই ঋণের ৮৭.১৫ লাখ টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিং নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে ২০২২ সাল থেকে তার আমদানি ব্যবসা কার্যত আটকে আছে।
ঘটনাটি নিয়ে দায়ের করা মামলার সিআইডি তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকটির ছয় কর্মকর্তা যোগসাজশ করে গ্রাহকের অজান্তে তার স্বাক্ষর নকল করেন। এরপর ব্যাংকের কাছে রাখা গ্রাহকের স্বাক্ষর করা খালি চেক ব্যবহার করে তার নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলেন এবং ঋণ অনুমোদন করেন।
চট্টগ্রাম সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল করিমের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, দালিলিক জালিয়াতি, জাল দলিল ব্যবহার ও হুমকির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
অভিযুক্তরা হলেন—ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার সাবেক ম্যানেজার মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম, তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার মো. মহিউদ্দিন, ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জুবায়ের আলম চৌধুরী, জুনিয়র অফিসার রাফায়েত সালাহ উদ্দিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা ও সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
যেভাবে হয় জালিয়াতি
২০২২ সালের ৯ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় মেসার্স আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ে নামে একটি চলতি হিসাব খোলেন নুরুল হুদা। আমদানি ব্যবসার জন্য ব্যাংকটির সঙ্গে নিয়মিত লেনদেন করছিলেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবার এলসি খোলার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নুরুল হুদার কাছ থেকে অলিখিত, শুধু স্বাক্ষর করা খালি চেক নিতেন। মোরশেদুল ও মহিউদ্দিনের নির্দেশে জুবায়ের এসব চেক সংগ্রহ করতেন। বাদীর আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে আসার পর সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে পণ্য খালাস শেষে বাদীর কাছে থেকে টাকা কর্তনের সময় এসব চেক ব্যবহার করার কথা। কিন্তু অভিযুক্তরা কৌশলে ব্যাংকের ভাউচারের সাহায্যে টাকা পরিশোধ করতেন; পরে তারা বাদীর কাছ থেকে নেওয়া চেকগুলো ফেরত না দিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখে দেন।
আল ওয়ালিদ ট্রেডিংয়ের নাম ব্যবহার করে চীন থেকে চায়না আপেল, চায়না আদাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়।
সিআইডির হিসাব অনুযায়ী, এসব আমদানির মোট মূল্য ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৫ ডলার (প্রায় ২.৩৬ কোটি টাকা)। নুরুল হুদার অজান্তে রমিজ ও মনির নামের ব্যক্তিসহ অভিযুক্তদের প্রতিনিধিরা এসব পণ্য খালাস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর সেগুলো দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে মুনাফা অর্জন ও আত্মসাৎ করে।
ব্যাংকের কাছে সংরক্ষিত নুরুল হুদার স্বাক্ষর করা খালি এলসি অনুমোদন ফরম ও অন্যান্য নথি ব্যবহার করে তার অজান্তে পাঁচটি মেয়াদি মুদারাবা পোস্ট ইমপোর্ট (এমপিআই) ঋণ হিসাব খোলা হয়।
তারা এই ব্যাংক হিসাবের এসএমএস অ্যালার্ট সেবাও বন্ধ করে দেন। ফলে টাকা জমা বা উত্তোলনের কোনো নোটিফিকেশন নুরুল হুদার কাছে পৌঁছাত না।
পাঁচটি ঋণ হিসাবের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২ টাকার ঋণ সৃষ্টি করা হয়। এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হয় আগে তৈরি করা আমদানি দায় সমন্বয়ের জন্য। পরে অভিযুক্তরা কিছু টাকা পরিশোধও করেন বলে তদন্তে উঠে আসে। এখন নুরুল হুদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৭ লাখ ১৫ হাজার ২৮৩ টাকা বকেয়া রয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঋণ পরিশোধের নোটিশ পাওয়ার পর নুরুল হুদা প্রথম এই ঋণ ও পণ্য আমদানির বিষয়টি জানতে পারেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, নুরুল হুদা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান এবং লিগ্যাল নোটিশ দেন। তখন সমাধানের পরিবর্তে তাকে গালিগালাজ, মামলা দিয়ে ফাঁসানো ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তদন্তে মামলা প্রত্যাহারের জন্য ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফরেনসিক পরীক্ষায় স্বাক্ষরের অমিল
আদালতের নির্দেশে বিতর্কিত ঋণসংক্রান্ত নথি সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। সেখানে হস্তলিপি বিশারদের মতামত নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নুরুল হুদার স্বাক্ষরের স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের মার্চে মহানগর হাকিম আদালতে দায়ের করা মামলায় ৯ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে সিআইডি ৩ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করে। তারা হলেন: ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ জোনাল অফিস সাউথের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ জহির উদ্দিন; মিয়া মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ ও মুহাম্মদ জুবায়ের আজম হেলালী।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
নুরুল হুদা বলেন, আমদানি ব্যবসার জন্য ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখায় হিসাব খোলার পর নিয়মিত এলসি খুলতেন। এলসি খোলার সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার কাছ থেকে স্বাক্ষর করা খালি চেকসহ বিভিন্ন কাগজপত্র নিত।
তার করা এলসির সংখ্যা ২০ থেকে ২৫টির মতো হতে পারে। এসব এলসির মাধ্যমে মূলত সৌদি আরব থেকে পণ্য আমদানি করতেন।
তবে পরে জানতে পারেন, তার হিসাব ব্যবহার করে সৌদি আরবের পাশাপাশি দুবাই, ভিয়েতনাম ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের নামে এলসি খোলা হয়েছে।
তার নামে মোট কতগুলো এলসি খোলা হয়েছে এবং এসবের বিপরীতে কী পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে, তা জানতে ব্যাংকের কাছে একাধিকবার স্টেটমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট নথি চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। বরং এক শাখা থেকে আরেক শাখায় যোগাযোগ করতে বলা হয় বলে জানান তিনি।
নুরুল হুদা বলেন, তার হিসাব ব্যবহার করে অনিয়মের পর তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয়। ২০২৩ সালের দিকে বিষয়টি প্রথম তার নজরে আসে।
ব্যাংক থেকে তার নামে বড় অঙ্কের একটি চেক আসার কথা জানানো হলে তিনি সেটি ইস্যু করেননি বলে জানান।
পরে ব্যাংকে গিয়ে তার নামে থাকা ঋণের নথি দেখতে চান। তখন দেখতে পান, তিনি নিজে কোনো ঋণ নেননি এবং কোনো ঋণ আবেদনপত্রে স্বাক্ষরও করেননি।
বিষয়টি সমাধানের জন্য শাখা, জোনাল অফিস ও হেড অফিসে দীর্ঘদিন যোগাযোগ করেছেন। কর্মকর্তারা সমাধানের আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ দেন এবং শেষপর্যন্ত আদালতের আশ্রয় নেন।
মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী নজরুল ইসলাম জানান, মামলাটি বর্তমানে চার্জ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে এবং সিআইডির চার্জশিট জমা হওয়ার পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর প্রাথমিক ধাপে পৌঁছেছে।
আদালতে জমা হওয়া সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ প্রসঙ্গে আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাদ পড়া ব্যক্তিরা সরাসরি যুক্ত না থাকলেও পরোক্ষভাবে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে অধস্তন কর্মচারীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ভার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপরই বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই আইনজীবী আরও জানান, জালিয়াতি এবং জালিয়াতিযুক্ত নথিপত্র ব্যবহার করে চেক জালিয়াতি ও আত্মসাতের বিষয়ে তারা আগেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ব্যাংক কতৃপক্ষ কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।
পুরো জালিয়াতির বিষয়টি পরবর্তীতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং অভিযোগ গঠনের সময়ে আদালতে এই বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে এক নম্বর আসামি মোহাম্মদ মোরশেদুল আলমকে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে মামলা চলমান আছে বলে কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল দিলেও সাড়া দেননি।
ইসলামী ব্যাংকের খুলশী শাখার ম্যানেজার মো. আবুল মনসুরও আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।- টিবিএস




















