ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশবন্ধু গ্রুপ। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া তাদের অধিকাংশ ঋণই এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকদের তালিকায় দেশবন্ধু গ্রুপের নাম রয়েছে।
খেলাপি ঋণের বিস্তারিত
জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে দেশবন্ধু গ্রুপ ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ গ্রহণ করেছিল। গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু সুগার মিলস লি., দেশবন্ধু ফুড এন্ড বেভারেজ লি., দেশবন্ধু টেক্সটাইল মিলস, সাউথইস্ট সোয়েটার্স লি. এবং এম. আর. ট্রেডিং-এর নামে এই ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন অর্থ ফেরত না দেওয়ায় বর্তমানে তা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ তালিকা অনুযায়ী, শুধু দেশবন্ধু সুগার মিলস লি.-এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৬৮ কোটি ৫ লাখ টাকা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আসল চিত্র
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। এরপর ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি যে ২৫০টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুন:তফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দেশবন্ধু গ্রুপও রয়েছে। এই নীতি সহায়তার ফলে ব্যাংক খাতে খারাপ প্রভাব পড়তে পারে বলে ওই কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
গ্রুপ ও ব্যাংকের বক্তব্য
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, দেশবন্ধু গ্রুপ থেকে অর্থ আদায়ে তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই, কিন্তু তারা অর্থ ফেরত দিতে গড়িমসি করছে।
অন্যদিকে, দেশবন্ধু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রহমান বলেন, তার গ্রুপ কখনোই সরকারের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়নি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন:
- গত এক বছরের বেশি সময় ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
- দেশের ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হার (১৫ থেকে ১৮ শতাংশ) এবং ডলারের উচ্চ মূল্য (৮৪ টাকা থেকে ১২৩ টাকা) পরিশোধ করতে গিয়ে গ্রুপের বড় ধরনের লোকসান হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা।
- দেশবন্ধু সুগার মিলে যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণের (বিএমআরই) পর প্রত্যাশিত আউটপুট না আসায়ও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
গোলাম রহমান আরও জানান, ২০০৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশবন্ধু গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ১৩ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যার মধ্যে ১২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে সুদ বাদে তাদের বকেয়া ঋণের পরিমাণ মাত্র ১২৭৮ কোটি টাকা। তিনি দাবি করেন, তাদের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ান কর্তৃক নিরীক্ষিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ঋণ পুন:তফসিল করে ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ দেয়, তাহলে গ্রুপের ২৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরোক্ষভাবে আরও ৫ থেকে ৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে।





















