যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তদন্ত করছে, সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নেই বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন এনবিআরের সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী। দুর্নীতির এই গুরুতর অভিযোগের মধ্যেই প্রায় ৫ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পর তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
মামলা দায়েরের মাত্র দুই দিনের মাথায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত প্রাস্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার দুদকের উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামান বাদী হয়ে বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার পরপরই বুধবার তাকে এনবিআরের সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) পদ থেকে কাস্টমস, এক্সাইজ এবং মূল্য সংযোজন কর আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এর একদিনের মাথায় তাকে সেখান থেকেও সরিয়ে ওএসডি করা হলো।
স্বার্থের সংঘাতের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ:
ডলার সংকট মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হলেও, গত ১৪ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় “ডেটা সেন্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিপোর্টিং” শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন বেলাল হোসাইন চৌধুরীসহ ১১ জন কর্মকর্তা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সফরের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করে ‘স্টার টেক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
অথচ এই স্টার টেক লিমিটেডের বিরুদ্ধেই নকল প্রযুক্তিপণ্য বিক্রি, মানি লন্ডারিং এবং বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করে উচ্চমূল্যে পণ্য বিক্রির অভিযোগে স্বয়ং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তদন্ত পরিচালনা করছে। তদন্তাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থে এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের ঘটনাকে সংশ্লিষ্টরা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) হিসেবে দেখছেন, যা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দুদকের মামলায় গুরুতর অভিযোগ:
দুদকের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বেলাল হোসাইন তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৪ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার ৭১৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে মোট ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে তার মোট ১৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বেশি সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলেও তিনি মাত্র ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাটি সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক আঁতাতের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। যে কর্মকর্তা একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্বে, তিনিই সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করছেন—এই ঘটনা সুশাসনের জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।






















