টেলিগ্রাম ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণা ও জুয়া এবং হুন্ডি কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকার পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে নেতৃত্ব দিতেন একটি পরিবারের ভাইবোন, মা ও ভগ্নিপতি।
এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ৯ জনের নামে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলায় আরও সাত-আটজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এজাহারনামীয় অভিযুক্তরা হলেন— আরিফুল ইসলাম রিফাত, মো. ইমরান হোসেন, মো. নুরে আলম, মোছা. লিলি আক্তার, মোছা. রিমি আক্তার, রুমি আক্তার, আব্দুল কাদির জিলানি, মুহা. নেয়ারামতুল্লাহ ও মো. রিয়াদ।
জসীম উদ্দিন খান বলেন, প্রতারক চক্রটি প্রথমে টেলিগ্রামে বিভিন্ন মানুষের কাছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রস্তাব দিত। পরবর্তী সময়ে কেউ সম্মত হলে তাকে এমন একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হতো, যেখানে ওই ভুক্তভোগী ছাড়া বাকি সব আইডি ভুয়া। সেখানে ভুয়া আইডির ইতিবাচক মন্তব্য দেখে ভিকটিমরা ফ্রিল্যান্সিং কাজে রাজি হলে তাদের প্রথমে সাধারণ কিছু কাজ দেওয়া হতো এবং প্রথমবার ৮-১০ হাজার টাকা প্রদান করা হতো। এতে ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করা হতো। একবার আস্থা তৈরি হলে বড় প্রজেক্টের প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত চক্রটি।
তিনি আরও বলেন, চক্রটি শুধু অনলাইন প্রতারণায় সীমাবদ্ধ থাকত না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দরিদ্র ও নিরক্ষর মানুষদের টার্গেট করত। তাদের সরকারি ভাতার প্রলোভন দেখিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হতো। এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ) অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। অনেক সময় মানুষ জানতও না যে তার নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো টেলিগ্রামে প্রতারণা, অনলাইন জুয়া ও হুন্ডির লেনদেনে। ভুক্তভোগীর জমা অর্থ ধীরে ধীরে চক্রের মূল সদস্যদের কাছে স্থানান্তরিত হতো।
তিনি আরও জানান, চক্রটি দেশের অসাধু ব্যবসায়ী ও ঘুষ-দুর্নীতির অর্থও হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাঠাত। অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল। একাধিক ভুয়া এবং পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ছোট ছোট লেনদেনের মাধ্যমে প্রকৃত উৎস গোপন করা হতো। এতে বাইরের কেউ সহজে বুঝতে পারত না কত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা একে অপরের অ্যাকাউন্টে পরপর অর্থ স্থানান্তর করত, যাতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হয়। সবশেষে, অর্জিত অর্থ ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো। তারা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডলার বা ক্রিপ্টো ক্রয় করে তা বিদেশি ঠিকানায় পাঠাত। এককথায় আস্থা তৈরি, বড় প্রজেক্টের প্রলোভন, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা এবং ক্রিপ্টো বা হুন্ডি ব্যবহার— সব মিলিয়ে চক্রটি মানুষের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
চক্রের প্রধান হোতাদের দায়িত্বে ছিলেন একই পরিবারের সদস্যরা। মূল নায়ক আরিফুল ইসলাম রিফাত, তার মা লিলি আক্তার, দুই বোন রিমি আক্তার ও রুমি আক্তার এবং বোনের স্বামী আব্দুল কাদির জিলানি সরাসরি প্রতারণার কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন।
সিআইডির মুখপাত্র জানান, অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়ার পর ৯ জনসহ অজ্ঞাতনামা ৭ থেকে ৮ জনের বিরুদ্ধে গত ৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।






















