দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) বর্তমানে দ্বৈত সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে ২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ব্যাংকটি ৩৫৩ কোটি টাকার বিশাল লোকসান গুনেছে, অন্যদিকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের বিরুদ্ধে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের এক গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই দুটি ঘটনা একসঙ্গে প্রকাশ্যে আসায় ব্যাংকটির পরিচালনা, স্বচ্ছতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুঁজিবাজারে ৩৫৩ কোটি টাকার লোকসান
দেশের পুঁজিবাজারের জন্য ২০২৪ সালটি ছিল একটি মন্দার বছর। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতও বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে দেশের ৩১টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে। লোকসানের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে অন্যতম হলো ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), যার লোকসানের পরিমাণ ৩৫৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও সোনালী ব্যাংকের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ লোকসান করেছে ইবিএল। এই বিপুল লোকসান ব্যাংকটির বিনিয়োগ কৌশলের দুর্বলতা এবং পুঁজিবাজারের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
চেয়ারম্যানের পরিবারের বিরুদ্ধে ৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ
পুঁজিবাজারের লোকসানের খবরের পাশাপাশি ইস্টার্ন ব্যাংকের ভাবমূর্তিকে আরও সংকটে ফেলেছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ। তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ১৪৬টি ব্যাংক হিসাবে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে জানা গেছে। যার ফলস্বরূপ, ওই ১৪৬টি ব্যাংক হিসাব বর্তমানে জব্দ (frozen) অবস্থায় রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং কর্পোরেট সুশাসন মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সমন্বিত সংকট ও ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারের লোকসান একটি সাধারণ ব্যবসায়িক ঝুঁকি হলেও, একই সময়ে ব্যাংকের শীর্ষ পদের ব্যক্তির পরিবারের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ইস্টার্ন ব্যাংকের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই দ্বৈত সংকট একদিকে যেমন ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি অন্যদিকে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের চিড় ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুদকের তদন্তে কী বেরিয়ে আসে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই সংকট মোকাবেলায় কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই এখন প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।






















