দেশের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) খাতে আস্থার সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জনপ্রিয় ওটিএ ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল’-এর শত শত কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনার পর এবার দেশের আরও দুটি শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্ম গো জায়ান (Go Zayaan) এবং শেয়ারট্রিপ (ShareTrip) নিয়ে গ্রাহক ও এজেন্টদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
যদিও এই দুটি কোম্পানির কার্যক্রম এখনও সক্রিয় রয়েছে, কিন্তু ফ্লাইট এক্সপার্ট, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল এবং তার আগে হালট্রিপ, ২৪টিকেট.কম-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আকস্মিক পতনের কারণে পুরো খাতের ওপর থেকেই গ্রাহকদের বিশ্বাস প্রায় উঠে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন অনেক গ্রাহকই গো জায়ান ও শেয়ারট্রিপে তাদের করা অগ্রিম বুকিং এবং জমাকৃত অর্থের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
আস্থার সংকটের মূল কারণ:
ফ্লাইট এক্সপার্ট ও ‘ফ্লাই ফার’ কেলেঙ্কারি: মাত্র দুই মাস আগে, আগস্ট মাসে, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ওটিএ ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা নিয়ে কানাডায় পালিয়ে যান। তাদের ওয়েবসাইট ও অফিস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার গ্রাহক এবং শত শত ট্রাভেল এজেন্সি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ঘটনা পুরো ভ্রমণ শিল্পে এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করেছে। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) অনলাইন টিকিটিং পোর্টাল ‘ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল’ বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। আকর্ষণীয় ছাড়ে বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং এবং ভ্রমণ প্যাকেজের লোভ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
অস্বাভাবিক ডিসকাউন্ট ও ব্যবসায়িক মডেল: ‘ফ্লাই ফার‘ ও ফ্লাইট এক্সপার্টের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বাজার দখলের জন্য অস্বাভাবিক ডিসকাউন্ট এবং আকর্ষণীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করত। অভিযোগ রয়েছে, তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে সেই টাকা অন্য খাতে বিনিয়োগ করত এবং নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে পুরনো গ্রাহকের টিকিটের খরচ মেটাতো। এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেলই তাদের পতনের মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গো জায়ান এবং শেয়ারট্রিপও প্রায়শই বড় ধরনের ডিসকাউন্ট অফার করায় গ্রাহকদের মনে এখন সংশয় তৈরি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা: ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল, হালট্রিপ, ২৪টিকেট ডট কম,‘লেটস ফ্লাই’ ফ্লাইট এক্সপার্টের মতো ওটিএ-গুলোর আকস্মিক পতন এই খাতের দুর্বল তদারকি এবং আইনি কাঠামোর অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে গ্রাহকদের স্বার্থ অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে, যার ফলে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে।
গো জায়ান ও শেয়ারট্রিপের বর্তমান অবস্থা:
এই দুটি প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের ওটিএ খাতে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তাদের একটি বড় গ্রাহক ভিত্তি রয়েছে। শেয়ারট্রিপ সম্প্রতি তাদের নির্ভরযোগ্যতা এবং গ্রাহক আস্থার জন্য ‘সুপারব্র্যান্ডস’ স্বীকৃতিও পেয়েছে। উভয় কোম্পানিই তাদের গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বচ্ছ এবং সুরক্ষিত।
তবে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক ট্রাভেল এজেন্ট বলেন, “ফ্লাইট এক্সপার্টের ঘটনার পর আমরা বড় কোনো প্ল্যাটফর্মকেই আর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। গো জায়ান বা শেয়ারট্রিপে আমাদের লাখ লাখ টাকা জমা আছে। বাজারের যা অবস্থা, তাতে কখন কী হয় বলা মুশকিল। আমরা এখন প্রতিটি লেনদেনের আগে দশবার ভাবছি।”
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাভেল সেক্টরে বর্তমানে কোনো সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো না থাকায় কোম্পানিগুলো অডিট বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন করছে। এতে প্রতারণার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশের সম্ভাবনাময় অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি খাতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে হলে কোম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর এক নেতা জানান, অনেক ওটিএ কোনো ধরনের লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যা এই খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন, “এই ধরনের প্রতারণা পুরো ট্রাভেল শিল্পের প্রতি মানুষের আস্থাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বারবার বলেছি যেন এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়।”






















