পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন, অর্থ পাচার এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৯ অক্টোবর থেকে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টেকজুম ডটটিভিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীন, কন্যা জারা নামরীন ও ছেলে জারান আলীর বিরুদ্ধে ব্যাংকিং চ্যানেলে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন, জাহাজ ভাঙার নামে এলসি খুলে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্তিত্বহীন শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি প্রতিবেদনের পর। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি আইনজীবী কামরুল ইসলাম বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ‘হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের’ অভিযোগ দ্রুত অনুসন্ধানের জন্য দুদক চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ জুন বিএফআইইউ শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দেয়। অবশেষে গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুদকে এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগপত্র জমা পড়লে কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।
অভিযোগের বিস্তারিত:
আইনজীবী কামরুল ইসলামের অভিযোগে এবং দুদকের নথিতে শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে:
- বিশাল অঙ্কের লেনদেন: শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ১৮৭টি ব্যক্তিগত হিসাব এবং তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ১৪৬টি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের সন্ধান পেয়েছে বিএফআইইউ। চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট ৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
- কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার: শুধু শওকত আলী চৌধুরীর ঢাকা ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখার একটি হিসাবেই প্রায় ৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা জমা হয়েছে, যা কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
- অস্বাভাবিক লেনদেন: শওকত আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইবিএল অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ১২৫ বার নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন। এছাড়া, তার কন্যা জারা নামরীনের আগ্রাবাদ শাখার হিসাবে ২০১৫ সালের এপ্রিলে মাত্র এক মাসে ৩১ কোটি টাকা জমা হয়, যা তার আয়ের উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
- শেল কোম্পানির ব্যবহার: শওকত আলী চৌধুরী ২০১২ সাল থেকে জাহাজ ভাঙার নামে ১৪১টি এলসি খুলেছেন। এর মধ্যে ১১টি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কোনো প্রমাণ মেলেনি। অভিযোগ উঠেছে, এসব এলসির বিপরীতে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত তিনটি অস্তিত্বহীন শেল কোম্পানিকে অর্থ পরিশোধ দেখানো হয়েছে, যা সরাসরি অর্থ পাচারের সামিল।
- রাজনৈতিক প্রভাব: অভিযোগে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এ জে এম নাসির, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস আলাউদ্দিন নাসিম এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন।
- বিদেশে সম্পদ: তিনি সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে অবৈধ অর্থ দিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সিঙ্গাপুরে তার নামে দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনজীবী কামরুল ইসলাম তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের এই গুরুতর ঘটনার যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তবে ভবিষ্যতে অন্যরা একই ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে। তাই এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।





















