দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি-এর সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। গুরুতর দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত এবং ৭ জন পরিচালকের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মোহাম্মদ আলীকে ماهانه ২৭ লাখ টাকা বেতনে তিন বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান।
এই ঘটনায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ এবং অংশীদারদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচালক জানিয়েছেন, পূবালী ব্যাংকের ১৪৮৯তম বোর্ড সভায় ১২ জন পরিচালকের মধ্যে ৭ জনের অনুপস্থিতিতেই এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা ব্যাংকের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত চেয়ারম্যান-এমডি সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান এবং এমডি মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
- চেয়ারম্যানের দুর্নীতি: মঞ্জুরুর রহমানের বিরুদ্ধে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ইতোমধ্যে প্রমাণিত এবং মামলাটি বিচারাধীন। অভিযোগ উঠেছে, ডেল্টা লাইফের মতো পূবালী ব্যাংকেও লুটপাট অব্যাহত রাখতে নিজের বিশ্বস্ত সহযোগী মোহাম্মদ আলীকে এমডি পদে রাখতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
- এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ: মোহাম্মদ আলী চেয়ারম্যানের সকল অপকর্মের মূল সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, নিয়োগ বাণিজ্য, ডলার কারসাজি, রহস্যজনক লেনদেন এবং ঋণ বিতরণে ভয়াবহ অনিয়মের চারটি পৃথক অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।
যেভাবে চলছে লুটপাট ও অনিয়ম
দুদক এবং ব্যাংক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:
১. সাদ মুসা গ্রুপ কেলেঙ্কারি: বিতর্কিত সাদ মুসা গ্রুপকে কোনোপ্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শত শত কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি পাওনার পরিমাণ ছিল ৩৭১ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এলসি সুবিধাসহ বিভিন্ন উপায়ে এই গ্রুপটি পূবালী ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় দুদক এমডি ও চেয়ারম্যানকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং শীঘ্রই মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২. করিম গ্রুপ কেলেঙ্কারি: ফরিদপুর-ভিত্তিক করিম গ্রুপকে প্রায় ১৮৪৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। অভিযোগ রয়েছে, এই বিশাল ঋণ অনুমোদনের জন্য এমডি মোহাম্মদ আলী এবং একজন পরিচালক ৫ শতাংশ হারে ঘুষ গ্রহণ করেছেন। পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই দেওয়া এই ঋণের প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আদায়যোগ্য নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
৩. ডলার কারসাজি ও অর্থ পাচার: ২০২৩ সালে এই চক্রটি ডলার কারসাজির মাধ্যমে ২১১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এছাড়া, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা না দেখিয়ে বিদেশে পাচার করার প্রমাণও দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।
नियामक সংস্থার রহস্যজনক নীরবতা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই масштабের দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলীকে পুনর্নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি শাখার প্রধান ও ডেপুটি গভর্নর কবির হোসেন সব ধরনের সহযোগিতা করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ লেনদেনের মাধ্যমে এই অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তা ও সচেতন পরিচালকরা আশঙ্কা করছেন, মোহাম্মদ আলী পুনরায় নিয়োগ পেলে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে এবং এটি একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। যেখানে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার অনিয়মের দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অপসারিত হয়েছিলেন এবং বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন, সেখানে এত অভিযোগ সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলীর পুনর্নিয়োগের চেষ্টা পুরো ব্যাংকিং খাতের সুশাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতিতে পূবালী ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কঠোর হস্তক্ষেপ না করলে পূবালী ব্যাংক আরও গভীর সংকটে পড়বে।






















