বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রাইম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিষ্ঠাতা আজম জে চৌধুরীর পরিবারের যে কর্তৃত্ব ছিল, তার কি আসলেই অবসান ঘটেছে? কাগজে-কলমে চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন এলেও বাস্তবে ব্যাংকটির নীতি নির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার প্রভাব কতটা কমেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, ২০২০ সালে আজম জে চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে ছেলে তানজিল চৌধুরীকে সেই পদে বসালেও, ব্যাংকটির মূল চালকের আসনে তিনিই রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটির ভেতরে তার অটুট প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
পারিবারিক প্রভাবের নেপথ্যে কী?
১৯৯৫ সালে প্রাইম ব্যাংকের যাত্রা শুরুর সময় থেকেই এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে আজম জে চৌধুরী ব্যাংকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে ব্যাংকটির পর্ষদে আজম জে চৌধুরীর দুই ছেলে তানজিল চৌধুরী ও তানভীর চৌধুরী পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
যদিও ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী দাবি করেছেন যে, তাদের পর্ষদ স্বচ্ছ এবং এখানে এককভাবে কেউ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না, তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনেকের মতেই, গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো এখনো আজম জে চৌধুরীর পরামর্শ বা সম্মতিতেই নেওয়া হয়।
আমানতকারীদের স্বার্থ কি উপেক্ষিত?
এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতে একটি বড় সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকে উদ্যোক্তা বা মালিকদের গড় শেয়ারের পরিমাণ মাত্র ২.৫ শতাংশের কিছু বেশি। এর বিপরীতে, ব্যাংকগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি অর্থই জোগান দেন সাধারণ আমানতকারীরা। অর্থাৎ, জনগণের টাকায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যখন কোনো ব্যাংকের পর্ষদে একটি পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী থাকে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। এর ফলে ঋণের ঝুঁকি পর্যালোচনা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আইনের পরিবর্তন কি প্রভাব ফেলবে?
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর হলে প্রাইম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে পারিবারিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটতে পারে। প্রস্তাবিত নতুন আইনে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক এবং টানা ছয় বছরের বেশি কাউকে পরিচালক পদে না রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে প্রাইম ব্যাংকের পর্ষদ থেকে চৌধুরী পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে দুইয়ে নেমে আসবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে থাকা পরিচালকদের বিদায় নিতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আইন বাস্তবায়ন করা গেলে তা ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। তবে প্রশ্ন হলো, আইনের ফাঁক গলে প্রভাবশালী পরিবারগুলো তাদের কর্তৃত্ব কতটা ধরে রাখতে পারে এবং আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে তাদের প্রভাব কতটা কার্যকর থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




















