পুঁজিবাজার থেকে রাইটস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের আবেদনে ভয়ংকর সব আর্থিক অসঙ্গতি ও নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ব্যাংকটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ৫ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার বিশাল প্রভিশন ঘাটতি এবং স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার ধারণে বড় ধরনের অনিয়মের মতো গুরুতর বিষয়গুলো সামনে আসায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) রাইটস ইস্যুর আবেদন আটকে দিয়েছে কমিশন।
সম্প্রতি বিএসইসি থেকে ইউসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এসব অসঙ্গতির বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে শুভঙ্করের ফাঁকি: মুনাফা নয়, লোকসান ৫ হাজার ৪৩০ কোটি!
বিএসইসির পর্যালোচনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি উঠে এসেছে ব্যাংকটির নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে। নিরীক্ষকরা ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে একটি ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ (Qualified Opinion) দিয়েছেন, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবে গুরুতর অসঙ্গতি নির্দেশ করে।
- প্রভিশন ঘাটতি: নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির ৫ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
- অতিরিক্ত সুদ আয়: নিয়মের বাইরে গিয়ে ১৯২ কোটি টাকার অতিরিক্ত সুদ আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিএসইসি বলছে, এই দুটি গুরুতর অসঙ্গতি যদি সঠিকভাবে সমন্বয় করা হয়, তাহলে ব্যাংকটির দেখানো ৩৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার মুনাফা আসলে ৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার বেশি লোকসানে পরিণত হবে। এর ফলে ব্যাংকটির ঘোষিত ২ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি এক লাফে বেড়ে দাঁড়াবে ৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে, ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CAR) নেমে আসবে মাত্র ৭.৪৪ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম ১২.৫০ শতাংশ থেকে অনেক নিচে।
সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, রাইটস শেয়ার ইস্যু করার জন্য পূর্ববর্তী বছরে কোম্পানির অবশ্যই সন্তোষজনক মুনাফায় থাকতে হবে। কিন্তু ইউসিবি বর্তমানে লোকসানে থাকায় এবং পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় রাইটস ইস্যুর কোনো যোগ্যতা রাখে না।
স্পন্সরদের শেয়ার ধারণে বড় ধরনের অনিয়ম
বিএসইসির ২০১১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইউসিবির স্পন্সর ও পরিচালকেরা বর্তমানে ব্যাংকটির মোট শেয়ারের মাত্র ১০.২৭ শতাংশ ধারণ করছেন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি রাইট শেয়ার বা অন্য কোনো উপায়ে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে না। ফলে, রাইটস শেয়ারের আবেদন করে ইউসিবি সরাসরি বিএসইসির এই নির্দেশনাও লঙ্ঘন করেছে।
কমিশনের কঠোর অবস্থান
এই গুরুতর অসঙ্গতিগুলোর কারণে বিএসইসি ইউসিবিকে ১৫ দিনের মধ্যে সকল বিষয়ে ব্যাখ্যা, ঘাটতি পূরণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র কমিশনে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকেও (ডিএসই ও সিএসই) ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ইউসিবির রাইটস ইস্যুর আবেদন বিষয়ে তাদের মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, “ইউসিবিএলের রাইট ইস্যুর আবেদন বিএসইসি যাচাই-বাছাই করে দেখছে। ইতিমধ্যে তাদের কাছে কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।”
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বিএসইসির এই পদক্ষেপকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একটি আর্থিকভাবে দুর্বল ও নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের রাইটস ইস্যুর আবেদন আটকে দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।






















