দেশে প্রতিদিন বিক্রি হওয়া ২৩ কোটি শলাকা সিগারেটে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) না মানার কারণে তামাক কোম্পানিগুলো বাজার থেকে দিনপ্রতি অতিরিক্ত ২৩ কোটি টাকা উঠিয়ে নিচ্ছে। এই কৌশলী কারসাজির ফলে কোম্পানিগুলো মাসে ৬৯০ কোটি ও বছরে অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। সিগারেটে মোট করভার ৮৩ শতাংশ হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় সরকার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতাদের কোনো প্রকার কমিশন না দেওয়া, বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য থেকে মাত্র ২ পয়সা কমে দোকানীদের কাছে সিগারেট বিক্রি করার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এই বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর (বিইআর) সম্মেলন কক্ষে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ ও কর বৃদ্ধিতে কোম্পানির প্রোপাগান্ডা মোকাবেলায় করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি সুশান্ত সিনহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকের ব্যবহার কমাতে সরকার বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। একইসাথে তামাকজাত দ্রব্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে নিতে প্রতি বছর এর মূল্য ও করহার বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো এই আইন সংশোধন ও কর বৃদ্ধি ঠেকাতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করছে।
বক্তারা আরও বলেন, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো মূল্য ও কর হার বৃদ্ধিকে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরতে চোরাচালানের গল্প সাজাচ্ছে এবং রাজস্ব কমে যাওয়ার মতো অকার্যকর তথ্য প্রচারের অপচেষ্টা করছে। তাদের মতে, সরকারের উচিত কোম্পানির এসব মিথ্যাচার আমলে না নিয়ে জনস্বার্থে অতিদ্রুত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করা এবং একটি টেকসই তামাক কর নীতি প্রণয়ন করা।

কর্মশালায় মূল বক্তব্যে বিইআর-এর প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, “তামাক কোম্পানি মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে চোরাচালানের মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, চোরাচালান সংক্রান্ত সংবাদগুলো অধিকাংশই হুবহু একই ধরনের এবং এর পেছনে কারা তাদের কোনো হদিস নেই। এসব ঘটনায় কাউকে আটক করতেও দেখা যায় না। সারাবছর খবর না থাকলেও জাতীয় বাজেটের ঠিক আগে চোরাচালানের খবর বেশি দেখা যায়। এর পেছনে তামাক কোম্পানির হাত রয়েছে বলে আমরা মনে করি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সিগারেটের দাম অনেক কম। ফলে চোরাচালানের এসব মিথ্যা ও সাজানো তথ্য কেবল বিভ্রান্ত করার জন্যই প্রচার করা হচ্ছে।” রাজস্ব আয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সিগারেট থেকে রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে ৩১ হাজার ৭৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আইন শক্তিশালী করার পরও গত ২০ বছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় কখনোই কমেনি।
প্যানেল আলোচক সুশান্ত সিনহা বলেন, “বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় বেশি দেখিয়েও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে তারা বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, অথচ তারাই রাজস্ব হারানোর ভয় দেখিয়ে মিথ্যাচার করছে।”
তিনি আরও বলেন, “তামাকজাত দ্রব্যে রাজস্ব ফাঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বর্তমানে প্রচলিত বহুস্তরভিত্তিক অ্যাডভেলরেম কর কাঠামো। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে এই পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তামাক কর কাঠামোর প্রচলন করতে হবে। এজন্য আসন্ন অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে প্রতি শলাকা সিগারেটে ১ টাকা হারে সুনির্দিষ্ট করারোপ করা যেতে পারে। এতে সরকারের প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।”
কর্মশালায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের ২০ জন গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন বিইআরের সিনিয়র প্রজেক্ট ও কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।






















