ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্ত করার ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দুর্নীতিবাজ শেখ ফজলে নূর তাপস বেসরকারি মধুমতি ব্যাংকে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আত্মীয়-স্বজন ও স্কুল বন্ধুদের এক সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে, যারা পতনের পরও এই দুর্নীতিবাজ চক্রকে আড়াল করে রেখেছেন।
ব্যাংকটির পরিচালক পদে রয়েছেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল (ভাইস চেয়ারম্যান) এবং মামাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাপসের শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার ৫০০টি এবং জুয়েলের শেয়ার ২ কোটি ৯ লাখ ৩৬ হাজার ৪৭৫টি।
আত্মীয়তার জালে সুরক্ষিত পর্ষদ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধুমতি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীরই এই চক্রকে রক্ষা করছেন। তিনি তাপস ও জুয়েলের ছুটি বারবার বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিচালক পদে বহাল থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন, যদিও তারা দেশ থেকে পালিয়েছেন। এই সহায়তার পেছনে রয়েছে সরাসরি পারিবারিক সম্পর্ক। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর সম্পর্কে শেখ ফজলে নূর তাপসের স্ত্রীর বোনজামাই।
মধুমতির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগ উঠেছে, যা ব্যাংকিং খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হুমায়ুন কবীর একটি নামমাত্র কোম্পানির মাধ্যমে শত কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেন, যা পরিশোধ করা হয়নি। ঋণখেলাপি হলেও মধুমতি ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করবে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে- হুমায়ুন কবীরের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নর্দার্ন হ্যাচারির অনুকূলে এনআরবিসি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১১৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। আর উত্তরা ফাইন্যান্সে একই প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা রয়েছে। নর্দার্ন হ্যাচারির পরিচালক হুমায়ুন কবীর।

এমডি পদেও আত্মীয়তার প্রভাব
এই আওয়ামী সিন্ডিকেটকে প্রত্যক্ষ সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) শফিউল আজমের বিরুদ্ধে। শফিউল আজম চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীরের স্কুলবন্ধু। অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যানের প্রভাব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সহযোগিতায়, শেখ হাসিনার পতনের পরও শফিউল আজম চতুর্থবারের মতো ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
দেশত্যাগী তাপসের অর্থ পাচারেও সহায়তা!
সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, মধুমতি ব্যাংকের দুর্নীতিপরায়ণ এডিশনাল এমডি শাহনেওয়াজ চৌধুরী, সিএফও মোশিউর এবং এইচআর হেড শফিকুর রহমান—এই তিনজন দেশ ত্যাগ করার পরেও শেখ ফজলে নূর তাপসের কালো টাকা পাচারে নিয়মিতভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। দেশত্যাগী পরিচালকের অবৈধ লেনদেনে ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই সক্রিয় সহায়তা পুরো ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শেয়ারহোল্ডার তালিকাতেও আওয়ামী লীগের ছড়াছড়ি
পরিচালনা পর্ষদের বাইরেও শেখ পরিবারের আরও সদস্য এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মধুমতি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—তাপসের ভাই ও যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস, সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব ও দিদারুল আলম। পর্ষদে আরও রয়েছেন মোস্তফা গ্রুপের আওয়ামী দোসর ও লুটপাটের শিরোমণি হিসেবে অভিযুক্ত মোস্তফা কামাল ও তার পরিবারের সদস্যরা।
ব্যাংকিং খাতের এই চিত্র দেখে সংশ্লিষ্টরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। যদি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমন হয়, যদি মধুমতি ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট এমন দুষ্কৃতিকারীতে পূর্ণ থাকে, তাহলে কেন এত তরুণ প্রাণ রক্ত দিল? কেন এত মায়ের বুক খালি হলো? এটাই যদি হয় এই রাষ্ট্রের অবস্থা—তাহলে সেই আত্মত্যাগ, সেই আন্দোলনের মূল্য কোথায়?
ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি
- ব্যাংকের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে আমানত ৮,০১১ কোটি টাকা।
- মোট ঋণ ৬৬৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ১৫৩ কোটি টাকা বা ২.৩০ শতাংশ।
- নিট মুনাফা ১২৬ কোটি টাকা।
- শাখা সংখ্যা ৫২, এটিএম ৪৭, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ৬৪৩। কর্মী সংখ্যা ৭৬০।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘ব্যাংকস হেলথ ইনডেক্স (বিএইচআই) অ্যান্ড হিট ম্যাপ’ অনুযায়ী, ইয়েলো জোনে থাকা ২৯টি ব্যাংকের মধ্যে মধুমতি অন্যতম।






















