অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ফুডপ্যান্ডা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ বিরাজ করছে। খাবার দেরিতে পৌঁছানো, ভুল অর্ডার, রিফান্ডে জটিলতা এবং কাস্টমার সার্ভিসের অদক্ষতা—এসব অভিযোগ নতুন নয়। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি ব্যবসায়িক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফুডপ্যান্ডার কার্যক্রম।
খাবার আসছে ঠান্ডা, রিফান্ড মিলছে না
রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা সাবরিনা ইসলাম গত সপ্তাহে ফুডপ্যান্ডা অ্যাপ থেকে দুপুরে একটি রেস্টুরেন্টের খাবার অর্ডার করেন। নির্ধারিত ৪০ মিনিটের বদলে খাবার পৌঁছায় দেড় ঘণ্টা পরে, তাও ঠান্ডা অবস্থায়। তিনি জানান, “রাইডার বলল রাস্তা ফাঁকা ছিল না। অথচ আমি অ্যাপে দেখছিলাম খাবার অনেকক্ষণ ডেলিভারি হাবে পড়ে ছিল।”

শুধু সাবরিনা নন, রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহরিয়ারও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বলেন, “একবার অ্যাপে পেমেন্ট কেটে নিলেও অর্ডার ক্যানসেল হয়ে যায়। এরপর বারবার অভিযোগ করেও টাকা ফেরত পাইনি।”
ফেসবুক ও বিভিন্ন গ্রাহক ফোরামে দেখা যায়, এমন অভিযোগের সংখ্যা অগণিত। অনেকেই ফুডপ্যান্ডার “চ্যাটবট কাস্টমার সার্ভিস” নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভুত রেস্টুরেন্ট ও অতিরিক্ত মূল্য
ফুডপ্যান্ডা অ্যাপে কিছু রেস্টুরেন্টের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকরা। অনেকে দাবি করছেন, এমন কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেগুলোর কোনো শারীরিক অবস্থান নেই, অথচ অ্যাপে তাদের খাবার দেখানো হয়। এছাড়া একই রেস্টুরেন্টের খাবার অ্যাপে অর্ডার করলে অনেক বেশি দাম দেখানো হয়, যা রেস্টুরেন্টে গিয়ে কিনলে কম পড়ে।
ফুডপ্যান্ডার একাধিক সাবেক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “অনেক সময় কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়, ডিসকাউন্ট দেখিয়ে গ্রাহককে আকৃষ্ট করার জন্য।”
ব্যবসায়িক অনিয়মে মামলা
সম্প্রতি আইপিএলই ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক–এর মালিক শিহাব মাহমুদ বশির ঢাকার একটি আদালতে ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশ এবং তাদের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ ডেলিভারি কার্যক্রম পরিচালনার পরও প্রতিষ্ঠানটি বিল প্রদান করেনি। প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে।
মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তবে ফুডপ্যান্ডা পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাইডারদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষ
ফুডপ্যান্ডার নিজস্ব রাইডারদের নিয়েও একাধিকবার অসন্তোষ দেখা গেছে। গত বছর ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও বসুন্ধরায় রাইডাররা বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি ছিল—পর্যাপ্ত কমিশন না দেওয়া, প্রায়ই বোনাস বন্ধ হওয়া, অমানবিক শর্তে কাজ করানো এবং হঠাৎ করে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা।
একজন রাইডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একদিনের ছুটির জন্য অনুরোধ করলেও ‘পারফরম্যান্স কম’ দেখিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। কেউ আমাদের কথা শুনে না।”
প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশ ও প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইপিএলই ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের মালিক শিহাব মাহমুদ বশিরের দায়ের করা মামলাগুলোয় যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ফুডপ্যান্ডা ও এর কর্মীদের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে এ অপচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে।
একসময় গ্রাহকদের কাছে নির্ভরযোগ্য অনলাইন ফুড ডেলিভারি সেবার প্রতীক ছিল ফুডপ্যান্ডা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক অভিযোগ, বিক্ষোভ ও মামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রশ্নের মুখে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠানটির উচিত—গ্রাহক অভিযোগের দ্রুত সমাধান, রাইডারদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
অতীতেও ফুডপান্ডা ও পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি এবং একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২০ সালে ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৪০ লাখ ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ ওঠে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি) ফুডপান্ডাকে একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনার জন্য ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। এই নতুন মামলা অনলাইন ফুড ও গ্রোসারি ডেলিভারি খাতের স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক নীতির ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।






















