ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, কিউকমের পর এবার অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’। আবারও গ্রাহকের অগ্রিম নেওয়া কয়েকশ কোটি টাকা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। দেশের অনলাইন সেবা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে একেবারে তলানিতে নিয়ে গেছে। লোভনীয় অফার দিয়ে অগ্রিম টাকা সংগ্রহ, তারপর পরিষেবা বা পণ্য দিতে ব্যর্থ হওয়া—এই চক্র যেন দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এক ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠেছে।
ফ্লাইট এক্সপার্টের এই ঘটনায় শুধুমাত্র ভ্রমণপিপাসু মানুষই নন, দেশের পুরো স্টার্টআপ জগত এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফ্লাইট এক্সপার্টসহ দেশের বেশিরভাগ ওটিএ প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে বিমান টিকিট বা ভ্রমণ প্যাকেজের জন্য অগ্রিম টাকা নিয়ে থাকে। অভিযোগ উঠেছে, ফ্লাইট এক্সপার্ট গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে টিকিট সরবরাহ করেনি। এক গ্রাহকের টাকা দিয়ে অন্য গ্রাহকের আংশিক প্রয়োজন মেটানোর একটি চক্র তৈরি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। নতুন গ্রাহক ও অর্থের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে।
এর আগে ই-কমার্স খাতে ই-অরেঞ্জ বা ধামাকার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও ছাড়ের লোভ দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অগ্রিম সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করে এক পর্যায়ে উদ্যোক্তারা লাপাত্তা হয়ে যান। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্লাইট এক্সপার্টের ঘটনাটি সেই তিক্ত ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। এটি প্রমাণ করে, শুধু ই-কমার্স নয়, যেকোনো খাতেই কঠোর নজরদারি ছাড়া অগ্রিম টাকার ব্যবসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ফ্লাইট এক্সপার্টের পতনের পর এখন শেয়ারট্রিপ, গো জায়ান, ট্রাভেলজু বা অন্য প্রতিষ্ঠিত ওটিএগুলোর ওপর গ্রাহকরা কীভাবে ভরসা রাখবেন, সেই প্রশ্ন উঠছে। যেহেতু প্রায় সব ওটিএ অগ্রিম টাকা ছাড়া বুকিং নেয় না, তাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার দায় এখন পুরো শিল্পকে বহন করতে হচ্ছে। ফ্লাইট এক্সপার্টের মত উধাও হয়ে যাওয়ার তালিকা আরও বাড়তে পারে ।
এ বিষয়ে একজন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপ উদ্যোক্তার মূল লক্ষ্য থাকে দ্রুত ফান্ডিং জোগাড় করে বা গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো। ৫ কোটি টাকা ফান্ডিং পেয়ে ২ কোটি টাকার গাড়ি কেনার মানসিকতা যতদিন থাকবে, ততদিন এই সংকট থামবে না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অবিলম্বে সকল ওটিএ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষা (অডিট) করে তদন্ত করতে হবে। ই-কমার্সের মতো ওটিএ খাতেও এসক্রো (Escrow) বা মধ্যস্থতাকারী পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে গ্রাহক সেবা পাওয়ার পরই কেবল প্রতিষ্ঠান টাকা পাবে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম টাকা নেওয়ার সীমা এবং শর্ত কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে।
এর আগে অনলাইন টিকিটিং এজেন্সি টোয়েন্টিফোর টিকিট ডটকম দুই বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিল । বিদেশগামীদের জন্য বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিট বুকিং দেখিয়ে ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে টাকা নেয় তারা। পরে ওই ব্যক্তিরা ফ্লাইট ধরতে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখেন তাঁদের নামে কোনো টিকিট বুকিং নেই। প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) অনুমোদনপ্রাপ্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বাকিতে টিকিট নিত। তারপর ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে টিকিট বুকিং রাখত।






















