বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের সৌরজগতে রয়েছে মোট ৮টি গ্রহ এবং প্রায় ২১৪-২৯৩টি উপগ্রহ। এই গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, এবং তা আমাদের সৌরজগতের বিস্তৃতি কুইপার বেল্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ সূর্য থেকে প্রায় ৩০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) দূরত্ব পর্যন্ত হতে পারে। আবার, ১৯৩০ সালে আবিষ্কৃত প্লুটোকে একসময় গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা (IAU) একে “বামন গ্রহ” হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
আসলে, ডুয়ার্ফ প্ল্যানেট প্লুটোর গ্রহত্ব বাতিল হওয়ার মূল কারণ ছিল যে, এটি কুইপার বেল্টের একটি সদস্য এবং এর কক্ষপথ অন্যান্য গ্রহের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন হয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের সোলার সিস্টেমের নেপচুন গ্রহের শেষ অংশ থেকে শুরু হওয়া কুইপার বেল্টের বাইরেও রয়েছে ওর্ট ক্লাউড নামক একটি বিশাল আকারের অতি শীতল অঞ্চল।
আর ওর্ট ক্লাউডে হয়ত মিলিয়ন মিলিয়ন বরফাচ্ছাদিত বস্তু এবং সম্ভাব্য অতি রহস্যময় গ্রহ (প্ল্যানেট নাইন) লুকিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। যদিও এই ধারণা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক গবেষণায় “প্ল্যানেট নাইন” নামে একটি রহস্যময় গ্রহের অস্তিত্বের সম্ভাবনা উঠে এসেছে, যা হয়ত এই অঞ্চলেই অবস্থান করছে।
বিজ্ঞানীদের শতবর্ষব্যাপী গবেষণায় দেখা যায় যে, আমাদের সৌরজগতের বাইরে, আকাশগঙ্গা ছায়াপথে ছড়িয়ে রয়েছে হয়ত কয়েক ট্রিলিয়ন গ্রহ, উপগ্রহ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু। এই গ্রহগুলোকে বলা হয় এক্সোপ্ল্যানেট বা বহিঃসৌরজগতিক গ্রহ। যদিও এক্সোপ্ল্যানেটের ধারণা বহু পুরোনো হলেও, বাস্তবিকভাবে টেলিস্কোপে প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত হয় ১৯৯৫ সালে। যার নাম দেওয়া হয় 51 Pegasi b।
এরপর থেকে প্রায় ৩০ বছরব্যাপী বিজ্ঞানীরা প্রায় ৬৫০০-এর অধিক এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার বা শনাক্ত করেছেন। যার মধ্যে অনেকগুলো পৃথিবীর মতো দেখতে “সুপার আর্থ” এক্সোপ্ল্যানেট হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আবার এই এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম বড়ো গ্রহ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে HAT-P-67b। এটি একটি গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ, যার ব্যাস হবে বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় ২.০৮৫ গুণ বড়ো।
তবে গত ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত HAT-P-67b এক্সোপ্ল্যানেটের ঘনত্ব অত্যন্ত কম হওয়ায় এর ভর স্বাভাবিকভাবে কম বলেই মনে করা হয়। গবেষণা অনুযায়ী, এর ভর হতে পারে বৃহস্পতি গ্রহের ভরের (Jupiter Mass) মাত্র ০.৩৪ গুণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর বিশাল আয়তনের পেছনে হয়ত লুকিয়ে রয়েছে এর অতি-কম ঘনত্ব এবং গ্যাসীয় প্রকৃতি। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১২০০ আলোকবর্ষ দূরে হারকিউলিস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থান করছে।
এটি একটি HAT-P-67 নামক এফ-টাইপ সাবজায়েন্ট নক্ষত্রকে মাত্র ০.০৬৫০৫ AU দূরত্ব থেকে প্রদক্ষিণ করে, এবং তার একটি পূর্ণ কক্ষপথ সম্পন্ন করতে সময় লাগে মাত্র ৪.৮ দিন। আবার এই নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে আনুমানিক ২০.৫ গুণ বড়ো এবং ১.৫ গুণ বেশি ভরসম্পন্ন হতে পারে। আসলে এই স্টার সিস্টেমটি হচ্ছে একটি বাইনারি স্টার সিস্টেম, যেখানে একটি এফ-টাইপ সাবজায়েন্ট এবং একটি লাল বামন নক্ষত্র রয়েছে।
এটি ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বিশাল আকারের এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে, তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড়ো এক্সোপ্ল্যানেট কিনা। কারণ, মানবজাতির প্রযুক্তি এখনো এতটা উন্নত হয়নি যে, আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বাইরের দূরবর্তী স্থানে লুকিয়ে থাকা বহিঃ সৌর জাগতিক গ্রহগুলো সরাসরি শনাক্ত করতে পারি।
তবে, পরিশেষে বলা যায়, HAT-P-67b-এর মতো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহিঃ সৌর জাগতিক গ্রহগুলো আমাদের মহাবিশ্বের অজানা রহস্য, বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বর্তমানে, বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় গ্রহ এবং এর বাইনারি স্টার সিস্টেম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করছেন। ভবিষ্যতে হয়ত এর চেয়েও আরও বড়ো এবং বিস্ময়কর এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হবে, যা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
তথ্যসূত্র : NASA Exoplanet Archive, Wikipedia, Live Science, নিজস্ব বিশ্লেষণ।
লেখক: সিরাজুর রহমান, (Sherazur Rahman), সহকারী শিক্ষক ও লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।




















