কাস্টমস বা বিমানবন্দরে যখন কারো কাছে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া স্বর্ণ পাওয়া যায়, তখন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন—সবাই একবাক্যে তাকে ‘চোরাচালান’ বলে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে ‘চোরাকারবারি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু একই কায়দায় যখন প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার মোবাইল ফোন ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে দেশের বাজারে ঢুকছে, তখন আমরা তাকে ‘আন-অফিশিয়াল ফোন’ বলে একটি ভদ্রতার মোড়ক দিচ্ছি।
প্রশ্ন উঠেছে, অপরাধের সংজ্ঞা কি পণ্যের মূল্যের ওপর নির্ভর করে, না কি অপরাধের ধরনের ওপর? যদি স্বর্ণ চোরাচালান অবৈধ হয়, তবে মোবাইল ফোন চোরাচালান কীভাবে বৈধ বা ‘কম অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে?
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে স্বর্ণ ও মোবাইল ফোনের অবৈধ আমদানির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয় ক্ষেত্রেই:
- রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব (ভ্যাট-ট্যাক্স) ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
- বৈধ আমদানিকারক ও দেশীয় শিল্পের সাথে অন্যায্য প্রতিযোগিতা করা হচ্ছে।
- পেমেন্ট করা হচ্ছে ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে, যা সরাসরি অর্থ পাচার (Money Laundering)।
তা সত্ত্বেও, দেশের মোবাইল মার্কেটগুলোতে গেলে দেখা যায় হাজার হাজার ‘আন-অফিশিয়াল’ ফোন প্রকাশ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ স্বর্ণের ক্ষেত্রে এমনটি অকল্পনীয়। এই ‘নরমালাইজেশন’ বা অপরাধকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিই আজ ৯৬ হাজার কোটি টাকার একটি অবৈধ বাজার তৈরি করেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আন-অফিশিয়াল’ শব্দটি আসলে একটি ধোঁয়াশা। এটি মূলত চোরাচালানকে আড়াল করার একটি ‘ভদ্র শব্দ’। যখন আমরা এই ফোনগুলোকে চোরাচালানের পণ্য না বলে ‘আন-অফিশিয়াল’ বলি, তখন ক্রেতারাও মনে করেন তারা কেবল একটি ওয়ারেন্টি ছাড়া ফোন কিনছেন। তারা বুঝতে পারেন না যে, তারা আসলে একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান ও অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছেন।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, এই অবৈধ মোবাইল ব্যবসার কারণে বছরে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে, তা স্বর্ণ চোরাচালানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, ৯৬ হাজার কোটি টাকার একটি টাকাও ব্যাংকিং চ্যানেলে না যাওয়ার অর্থ হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সরাসরি কুঠারাঘাত।
সরকার এখন এনইআইআর (NEIR) বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ‘ভদ্রবেশী চোরাচালান’ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণ চোরাচালান রোধে রাষ্ট্র যেমন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে, মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব দরকার। দোকানে সাজিয়ে রাখা প্রতিটি অবৈধ ফোনকে ‘চোরাই পণ্য’ হিসেবে গণ্য করে আইনি ব্যবস্থা না নিলে এই ৯৬ হাজার কোটি টাকার রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না।
অপরাধী যখন স্বর্ণ আনে তাকে বলা হয় ‘চোরাকারবারি’, আর যখন মোবাইল ফোন আনে তাকে বলা হয় ‘আন-অফিশিয়াল বিক্রেতা’। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে। চোরাচালান সবক্ষেত্রেই চোরাচালান, তা সেটি স্বর্ণ হোক কিংবা সিলিকন চিপের স্মার্টফোন।






















