কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের অধীন নিম্ন আয়ের এলাকাগুলোতে সারা বছরই থাকে নিরাপদ পানির সংকট। বর্ষা মৌসুমে সেটি পৌঁছে চরম পর্যায়ে। দৈনন্দিন কাজে এসব এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল পুকুরের পানি। বর্ষায় যা তলিয়ে গিয়ে ময়লায় ভেসে যায়, ফলে নিরাপদ পানির সংকট ছিল তীব্রতর।
সরেজমিনে দেখা যায়, এখন কুমিল্লায় সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। নিরাপদ পানির সরবরাহ আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষের কমিউনিটিতে। নতুন করে উঁচু ও জলাবদ্ধতা–সহনশীল পানি–পয়েন্টগুলো বর্ষাকালে পানিবাহিত বিঘ্ন কমাতে সহায়তা করছে। ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন ফর দ্য আরবান পুওর (ডব্লিউএসইউপি) বাস্তবায়িত এবং দ্য কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের (টিসিসিএফ) অর্থায়নে পরিচালিত ‘রেজিলিয়েন্ট ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রোগ্রামিং ফর লো-ইনকাম কমিউনিটিজ’ প্রকল্পের আওতায় এই উন্নয়ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
জলাবদ্ধ এলাকায় দূষণ ও পানিসংকট এড়াতে মাটির ওপরে উঁচু করে এসব পানি–পয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় যেসব এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হতো, সেখানে বিশেষভাবে এই কাঠামো ডিজাইন করা হয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় বর্ষাজনিত কারণে পানি সরবরাহে বিঘ্নের হার কমে এসেছে। ডাব্লিউএসইউপি-টিসিসিএফ প্রকল্পের মাধ্যমে উঁচু প্ল্যাটফর্ম, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পুনর্বাসিত পাইপলাইনের ফলে এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৭৭ হাজারের বেশি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ পানি ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ঢাকনাযুক্ত পাত্রে পানি সংরক্ষণের হার বেড়ে ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে এবং প্রতিদিন পানির পাত্র পরিষ্কারের হার ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই জলাবদ্ধতা–সহনশীল পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ, যার মাধ্যমে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পাচ্ছেন। এর মধ্যে স্কুল উন্নয়ন ও কমিউনিটির সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দুই শহরের বিভিন্ন স্কুলে এখন ১১ হাজার ২৭০ জন শিক্ষার্থী পরিশোধিত পানির ব্যবস্থা ও হাত ধোয়ার সুবিধা পাচ্ছে, ফলে পানিবাহিত রোগজনিত অনুপস্থিতি কমেছে।
পদুরবাজার রোডের দিশাবন্ড কমিউনিটি এলাকায় প্রবেশ পথের পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। পানির রং বদলে কালো হয়ে গেছে। রয়েছে অনেক কচুরিও। সেটিই ছিল নাজমা আক্তারের মতো নারীদের পানির মূল উৎস। দৈনন্দিন যাবতীয় কাজ সে পানিতেই সারতে হতো। বর্সকালে পুকুর ভরে গেলে পানি আরও দূষিত হয় বলে জানান তিনি।
নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমাদের এখানে সব পরিবারই এই এক পুকুরের পানি ব্যবহার করতাম। ময়লা পানিতেই গোসল, ধোয়ামোছা, কাপড়কাঁচার কাজ করা হতো। ডাব্লিউএসইউপি-টিসিসিএফ যখন থেকে আমাদের এখানে উঁচু জায়গায় পানির পয়েন্ট তৈরি করে দিল, আমাদের কষ্ট যেন এক নিমিষেই দূর হয়ে গেল। এখন খাবার পানি যেমন দূর থেকে আনতে হয় না, তেমনি বাড়ির যাবতীয় কাজ এই পানিতেই করতে পারি।’
ডাব্লিউএসইউপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার উত্তম কুমার সাহা বলেন, ‘জলাবদ্ধতাপ্রবণ কুমিল্লার এলাকাগুলোতে আমাদের নির্মিত উঁচু প্ল্যাটফর্মে স্থাপিত পানি–পয়েন্টগুলো বর্ষা ও বন্যার সময়ে নিরাপদ পানির সংকট কমাতে সহায়তা করেছে। আগে জলাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত পানি সরবরাহ ব্যাহত হতো, কিন্তু এখন ওইসব কমিউনিটি পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন পানির সুবিধা পাচ্ছে। আমাদের প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় বর্ষাকালজনিত পানি–সংযোগ বিঘ্নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।’
স্থানীয় পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত কেয়ারটেকার ও প্রয়োজনীয় টুলকিট সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়লেও এসব উঁচু পানি–পয়েন্ট দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটিগুলোর জন্য টেকসই ও নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




















