অনেকেই ভাবছেন এপস্টিন ফাইলস সুবিন্যস্ত কোনো তালিকা বা লিস্ট। কিন্তু বাস্তবে তা ভিন্ন। এটি মূলত মার্কিন ধনকুবের এবং কুখ্যাত শিশু যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন ও তার সহযোগী ঘিশলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলার বিশাল নথিপত্র। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ নথিপত্র, ২,০০০ টি ভিডিও এবং ১,৮০,০০০ টি ছবি।
মূলত এই ফাইলের উপাদান তিনটি। প্রথমত, ফ্লাইট লগ। এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমান, যা কুখ্যাত ‘ললিটা এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত, তাতে কারা যাতায়াত করতেন তার তালিকা। দ্বিতীয়ত, লিটল ব্ল্যাক বুক। ৯৭ পাতার একটি ডায়েরি। এটি মূলত ছিল একটি ফোনবুক বা ডিরেক্টরি। তৃতীয়ত, আইনি জবানবন্দি ও ইমেল। ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের ইমেল চালাচালি।
তবে আমজনতা যে ক্লায়েন্ট লিস্ট বা অপরাধীদের তালিকার খোঁজ করছে, মার্কিন বিচার বিভাগ সাফ জানিয়েছে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকার অস্তিত্ব নেই। যা আছে, তা হলো হাজার হাজার তথ্যের টুকরো, যা জোড়া লাগিয়ে সত্য বের করতে হবে।
নথিপত্রের পাতা উল্টালে দেখা যায় বিশ্বের তাবড় তাবড় সব নাম। তবে ডিওজে জানিয়েছে নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়।
মার্কিন রাজনীতি ও রাজপরিবার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নথিতে এক হাজারেরও বেশিবার এসেছে। এটি শুনে চমকে ওঠার মতো হলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। ট্রাম্পের সাথে এপস্টিনের কোনো সরাসরি ই-মেল পাওয়া যায়নি। একটি ই-মেলে ট্রাম্পকে “The dog that didn’t bark” অর্থাৎ ‘যে কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করেনি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ট্রাম্পকে অপরাধমূলক কাজে সরাসরি যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ পাননি।
অপরদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম নথিতে বারবার এসেছে। যদিও তিনি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তার উপস্থিতি এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। এছাড়াও ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বেশ গুরুতর, যা নথিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ শুধু রাজনীতিবিদ নন, টেক দুনিয়ার মহাতারকা বিল গেটস ও ইলন মাস্কের নামও জড়িয়েছে এই নথিতে। এপস্টিনের সাথে তাদের বৈঠকের তথ্য ও ছবি নথিতে পাওয়া গেছে। এমনকি বিখ্যাত ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কির সাথেও এপস্টিনের নিয়মিত যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। স্টিভ ব্যানন ও পিটার থিয়েলের মতো ব্যক্তিদের সাথেও বৈঠকের প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকাশিত হাজার হাজার পাতার নথিতে এখন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় বা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা তারকার নাম পাওয়া যায়নি। এই কেলেঙ্কারিটি মূলত মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রভাবশালী বলয়েই সীমাবদ্ধ।
নাম থাকা বনাম অপরাধী হওয়া : সূক্ষ্ম কিন্তু বিশাল পার্থক্য
মিডিয়ার হাইপ আর বাস্তবতার সংঘাত এখানেই। এপস্টিনের ‘ব্ল্যাক বুক’ আসলে ছিল একটি ফোন ডিরেক্টরি। সেখানে যেমন বিল ক্লিনটনের নাম ছিল, তেমনি ছিল এপস্টিনের মালি, নাপিত এবং ইলেকট্রিশিয়ানের নামও। তাই নাম থাকলেই তাকে অপরাধী বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম ১,০০০ বার আসা কিংবা চমস্কির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ প্রমাণ করে, তাদের সাথে এপস্টিনের গভীর সামাজিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তবে মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্ত বলছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এই তালিকার ব্যক্তিরা ব্ল্যাকমেইলের শিকার বা সরাসরি যৌন অপরাধে যুক্ত ছিলেন।
আসল অপরাধী হিসেবে ঘিশলেন ম্যাক্সওয়েল বা জঁ-লুক ব্রুনেলের নাম এসেছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে। তারা নারী পাচার ও নির্যাতনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
অন্ধকার জগতের শিকার : ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
নথিপত্র ঘেঁটে এক ভয়াবহ প্যাটার্ন বা ছক চিহ্নিত করা গেছে। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ছিলেন কিশোরী বা অল্পবয়সী নারী। যেমন, ভার্জিনিয়া জুফ্রে যখন ট্রাম্পের মার-আ-লাগো স্পা’তে নিয়োগ পান, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭। তারা অনেকেই আর্থিক অনটনে থাকা সাধারণ পরিবারের মেয়ে ছিলেন।
তাদের প্রলুব্ধ করা হতো ‘মাসাজ থেরাপিস্ট’ বা মডেলিংয়ের চাকরির টোপ দিয়ে। এপস্টিনের সহযোগী ঘিশলেন ম্যাক্সওয়েল মেয়েদের বিশ্বাস অর্জন করে তাদের এপস্টিনের হাতে তুলে দিতেন। ভুক্তভোগীর সংখ্যা ঠিক কত তা নির্দিষ্ট করে প্রকাশিত হয়নি, তবে নথিতে ‘অনেক ভুক্তভোগী’ শব্দের ব্যবহার এবং ‘শিশু পর্নোগ্রাফি’ সংক্রান্ত তথ্যের উপস্থিতি বলে দেয়, এই জঘন্য সাম্রাজ্য ছিল বিশাল।
রহস্যের জট খুলল যেভাবে : আদালত বনাম রাজনীতি
উক্ত ফাইলগুলো কোনো একক ঘটনায় প্রকাশিত হয়নি। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকরা এবং পরবর্তীতে বিচারক লোরেটা প্রেসকার আদেশে ঘিশলেন ম্যাক্সওয়েলের মামলার নথিপত্র প্রকাশ শুরু হয়।
তবে আসল খেলা শুরু হয় ২০২৫ সালে। রাজনৈতিক চাপে ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস হয়। হাউজ ওভারসাইট কমিটি এবং বিচারক রডনি স্মিথের নির্দেশে হাজার হাজার পাতা প্রকাশ করা হয়। বিচার বিভাগ ১৯ ডিসেম্বর কিছু ফাইল প্রকাশ করলেও অনেক তথ্য কালিতে ঢাকা বা সেন্সর করে দেয়া, যা নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই অসন্তোষ ছিল। অবশেষে ২০২৬ সালের এই জানুয়ারি মাসের শেষে এসে বড় অংশটির দেখা পাওয়া যায়।
ইন্টারনেট দুনিয়া আর বাস্তব তদন্তের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ইলন মাস্ক বা অ্যালেক্স জোনসের মতো ব্যক্তিরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছিলেন যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ আছে এবং ট্রাম্পের নাম সেখানে লুকানো হচ্ছে। কিন্তু এফবিআই তদন্তে সেই লিস্টের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ‘এপস্টিন ন্যারেটিভ’ বা গল্প ছড়ানো হয়, তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মত প্রকাশ করেছে ডিওজে।
ন্যায়বিচার কি অধরাই থেকে গেল?
জেফ্রি এপস্টিন কারাগারে মারা গেছেন। সরকারিভাবে একে আত্মহত্যা বলা হলেও জনমনে সন্দেহ রয়ে গেছে। ঘিশলেন ম্যাক্সওয়েলও জেলে আছেন। কিন্তু বাকিরা?
ফাইলগুলো প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, পাহাড় খুঁড়ে ইঁদুর বের হওয়ার মতো অবস্থা। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এলেও, তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করার মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এফবিআই পায়নি। ভুক্তভোগীরা হতাশ। তারা হুমকি দিয়েছেন, সরকার ব্যর্থ হলে তারা নিজেরাই তাদের জানা নামগুলো প্রকাশ করবেন।
অনেকেই মত প্রকাশ করে বলেছেন, এপস্টিন ফাইলস কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এটি একটি অসমাপ্ত সত্যের দলিল। ক্ষমতার করিডোরে অনেক নাম হয়তো কালিতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, অনেক ই-মেইল মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু বিচারক রডনি স্মিথ গ্র্যান্ড জুরির জবানবন্দি প্রকাশের যে নির্দেশ দিয়েছেন, হয়তো সেখান থেকেই বেরিয়ে আসবে আসল সত্য।




















